সুন্দরবনের মৌয়াল: পেটের টানে যাদের কাছে ভোট উৎসব ‘তুচ্ছ’

পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনি উত্তাপ

জঙ্গলে মধু সংগ্রহে যাচ্ছে মৌয়ালরা
জঙ্গলে মধু সংগ্রহে যাচ্ছে মৌয়ালরা | ছবি: এখন টিভি
0

ওপারে ভোটের বাদ্য বাজছে, এপারে বইছে জীবনসংগ্রামের উত্তাল হাওয়া। ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যজুড়ে এখন নির্বাচনি উত্তাপ, কিন্তু সুন্দরবনের গহীন অরণ্যের প্রান্তিক মানুষগুলোর কাছে সেই উত্তাপের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘টিকে থাকার লড়াই’। সুন্দরবনের মৌয়ালদের কাছে ভোট আসে, ভোট যায়; কিন্তু বাঘ, কুমির আর জলদস্যুর ভয় তাড়া করা জীবনে বিশেষ কোনো পরিবর্তন আসে না। তাই নির্বাচনের ডামাডোল উপেক্ষা করেই এবারও মধু সংগ্রহের নেশায় জঙ্গলে পাড়ি জমিয়েছেন শত শত মৌয়াল।

‘সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পে’ এলাকা থেকে এবার মোট ৪৯টি দলে বিভক্ত হয়ে ৪২৮ জন মৌয়াল গভীর অরণ্যে প্রবেশ করেছেন। বন দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, সজনেখালি রেঞ্জ থেকে ১৬টি এবং বসিরহাট রেঞ্জ থেকে ৩৩টি দল এরইমধ্যে তাদের অভিযান শুরু করেছে। মৌয়ালদের এ যাত্রার মূল লক্ষ্য হলো, সুন্দরবনের খাঁটি মধু সংগ্রহ করা, যা তাদের সারা বছরের আয়ের প্রধান উৎস।

চলতি বছর বন দপ্তর ১৫ মেট্রিক টন মধু সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। প্রাথমিকভাবে মৌয়ালদের ১৫ দিনের জন্য জঙ্গলে থাকার অনুমতি দেয়া হয়েছে। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলে দ্বিতীয় দফায় আবারও অনুমতি দেয়া হতে পারে। সুন্দরবন বাঘ সংরক্ষণ প্রকল্পের সহকারী বন সংরক্ষক (এএফডি) পার্থ দেবনাথ এখন টিভিকে জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও মৌয়ালদের মধু সংগ্রহের অনুমতি দেয়া হয়েছে। তারা যেন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করে নিরাপদে ফিরে আসতে পারেন, সেটাই প্রত্যাশা।

মৌয়ালদের নিরাপত্তায় রাজ্যের বন দপ্তর বিশেষ উদ্যোগ হিসেবে ‘অপারেশন গোল্ডেন হানি’ চালু করেছে। এছাড়া অরণ্যে কোনো দুর্ঘটনার শিকার হলে তাদের জন্য রয়েছে বিশেষ বিমা ব্যবস্থাও।

উল্লেখ্য, সুন্দরবনের গ্রামীণ অর্থনীতিতে মধু সংগ্রহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সংগৃহীত সব মধু বন দপ্তর সরাসরি মৌয়ালদের কাছ থেকে কিনে নেয়। এবার গ্রেড ‘এ’ মধুর দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ২৭৫ টাকা এবং গ্রেড ‘বি’ মধুর দাম ২৫০ টাকা।

বাইরে যখন ভোটের প্রচার আর রাজনৈতিক উত্তাপ চলছে; তখন মৌয়ালদের কণ্ঠে ঝরে পড়ছে ভিন্ন সুর। এক মৌয়ালের কথায়, ‘ভোট দিয়ে তো আর সংসার চলে না। মধু সংগ্রহে না গেলে আয় বন্ধ হয়ে যাবে, সন্তানদের লেখাপড়া থেমে যাবে। আমাদের কাছে পেটের টানই বড় ভোট।’

গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হওয়ার চেয়ে সুন্দরবনের এই প্রান্তিক মানুষদের কাছে বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ভোটের হাওয়া যতই বইুক না কেন, সুন্দরবনের মৌয়ালদের কাছে জীবনের গাণিতিক হিসাবটাই এখন ধ্রুব সত্য।

এএম