নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে ইরানের অস্ত্র আমদানিতে গোপন নেটওয়ার্ক

অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম
অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম | ছবি: সংগৃহীত
0

যুক্তরাষ্ট্রের বন্দর অবরোধ আর নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই যুদ্ধের সরঞ্জাম আমদানির জন্য বিশ্বজুড়ে গোপন এক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে ইরানের সামরিক এজেন্সিগুলো। বছরের প্রথম ৬ মাসে এই নেটওয়ার্কের সহায়তায় ১৯ লাখ ডলারের যুদ্ধাস্ত্র আমদানি করেছে তেহরান- দাবি রয়টার্সের। প্রায় ২০ হাজার ফাইল ঘেটে দেখা যাচ্ছে কোনো শুল্ক ছাড়াই অভিজাত অস্ত্রের চালান আসছে ইরানি বন্দরে। আর বিদেশি ব্যাংক একাউন্ট থেকে অর্থ পৌঁছে যাচ্ছে মধ্যস্থতাকারী এজেন্টের কাছে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, রসিদ বা চালানের টোকেন-কোথাও আসছে না ক্রেতা-বিক্রেতার নাম।

পেন্টাগনের হিসাবে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে মার্কিন করদাতাদের প্রায় ৪ হাজার ৭শ কোটি ডলার খরচ হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বিভাগে প্রতিবেদন অনুযায়ী অক্টোবরের ১৬ তারিখ পর্যন্ত শুধু সামরিক সরঞ্জামের পেছনে ব্যয় ২ হাজার ৯শ কোটি ডলার।

অথচ নিষেধাজ্ঞায় জর্জরিত ইরান কীভাবে হাজার হাজার ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন নিক্ষেপ করার পরও নিজেদের অস্ত্রভাণ্ডার আবারও ভর্তি করে ফেলছে, গেল ৮ মাসের সংঘাতে এটাই সবচেয়ে বড় রহস্য। যা ভেদ করার চেষ্টা করেছেন রয়টার্সের ৩ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত একটি গোপন নেটওয়ার্ক গড়ে অন্তত ২শ কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম, বিস্ফোরক ও ভারী ট্রাক আমদানি করেছে ইরান। যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পরেও অস্ত্রের যোগান এসেছে ইরানের সামরিক এজেন্সিগুলোর সুবাদে। শুধু এ বছরের প্রথম ৬ মাসে ১৯ লাখ ডলারের ডেটোনেটর, কয়েক টন বিস্ফোরক, উড়োজাহাজের ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, রকেট জ্বালানির উপাদান এবং ভারী উৎক্ষেপণ যান আমদানি করেছে ইরান।

শক্তিশালী এই আর্থিক ও সামরিক ব্যবস্থার পেছনে আছে এমওডি দিয়ে শুরু হওয়া ৫ হাজারেরও বেশি সংস্থা বা এজেন্সি। মোড হচ্ছে ইরানি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, মিনিস্ট্রি অব ডিফেন্স এন্ড আর্মড ফোর্সেসের ইংরেজি সংক্ষিপ্ত রূপ। এসব এজেন্সির অস্ত্র আমদানি সংক্রান্ত নথি আছে ২০১৬ সাল থেকে। যেখানে বিপ্লবী গার্ড কর্পস ও প্রজাতন্ত্রের অভিজাত ব্যাবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণাধীন আধা-সরকারি ট্রাস্ট ‘বোনিয়াদ’ যোগসূত্রেরও প্রমাণ মিলেছে।

আরও পড়ুন:

জানুয়ারি ২০২৫ থেকে জুন ২০২৬ - এই ১৮ মাসে এমওডি-৩৪৬৪২৮ নামের একটি এজেন্সি বিপুল পরিমাণ রকেটের জ্বালানি তৈরির উপাদান, বিস্ফোরক, অস্ত্রের যন্ত্রাংশ এবং ভারী ট্রাক আমদানি করে যার বেশিরভাগ এসেছে চীন, রাশিয়া ও জার্মানি থেকে। ইরানি ব্যাংক ও সরকারি নথি, কোম্পানির নিবন্ধন সংক্রান্ত তথ্যেও সত্যতা মিলেছে এমওডি নেটওয়ার্কের।

উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোতে ইরানের ধারাবাহিক ও নির্ভুল হামলার সাফল্যও এসেছে অভিজাত অস্ত্রের একের পর এক চালানের কারণে। ২৩ সেপ্টেম্বর চীন থেকে আসা কয়েকটি চালানের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে একই তথ্য হাজির করে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল। যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ-পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচতে দৃশ্যমান বাণিজ্যব্যবস্থার সমান্তরালে সামরিক সংস্থাগুলোর এই বিকল্প প্ল্যান। আর এই অস্ত্র আমদানি ৯৭ শতাংশ চালানের লেনদেনই অর্থ স্থানান্তর ছাড়া সম্পন্ন হয়, বিশ্বস্ত মধ্যস্থতাকারীরা ভিনদেশি ব্যাংকে থাকা নগদ অর্থ ব্যবহার করে পণ্য কেনেন এবং সেগুলো ইরানে পাঠান।

যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের সামরিক বাহিনীর কেনা ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের পণ্য এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে, সবই প্রায় সমুদ্রপথে। রাশিয়া থেকে কাস্পিয়ান সাগর পেরিয়ে পণ্যবাহী জাহাজে, মধ্য এশিয়া থেকে ট্রাকে এবং চীন থেকে কার্গো বিমানে করেও তেহরানে এসেছে যুদ্ধ সরঞ্জাম। যদিও এসব চালানের ব্যাপারে মুখ খোলেনি মস্কো বা বেইজিং, নীরব আমিরাতও। আর ইরানের দূরদর্শীতা স্বীকার করা পরাজয় মনে করে এমওডি নেটওয়ার্ক নিয়ে কথাই বলে না ওয়াশিংটন।

এফএস