মার্কিন সংবাদমাধ্যম এক্সিওসের প্রতিবেদনে দেশটির কর্মকর্তাদের বরাতে জানানো হয়, বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধের পর গত ছয় মাসে নেতানিয়াহুর কার্যকলাপে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প এর আগে কখনো অন্য কোনো ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কাজ করেননি এবং বিকল্প প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠ পরিচয় নেই। ট্রাম্পের দৃষ্টিভঙ্গি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তার এক উপদেষ্টা জানান, ট্রাম্পের কাছে নেতানিয়াহু হলেন এমন এক চেনা মানুষ, যার ভালো ও মন্দ সবকিছুই তার জানা।
নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে গত ১৮ অক্টোবর নেতানিয়াহুকে আনুষ্ঠানিক সমর্থন দেন ট্রাম্প। সে সময় তিনি ইঙ্গিত দেন যে নেতানিয়াহু পরাজিত হলে ওয়াশিংটন-তেলআবিব সম্পর্কের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টাদের একটি বড় অংশ এই সমর্থনের বিপক্ষে ছিলেন এবং তারা ইসরাইলি নির্বাচন থেকে ট্রাম্পকে নিরপেক্ষ থাকার পরামর্শ দিয়েছিলেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা জানান, ট্রাম্পের এই অবস্থান মূলত দুই দিক থেকেই লাভজনক। নেতানিয়াহু বিজয়ী হলে ট্রাম্প সেই কৃতিত্ব দাবি করে নিজেদের স্বার্থ আদায় করতে পারবেন। আর নেতানিয়াহু পরাজিত হলেও ইসরাইলের যেকোনো নতুন সরকারকেই ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলতে হবে। এছাড়া নেতানিয়াহুর বর্তমান জোটের উগ্র ডানপন্থি শরিকদের ছাড়া কোনো উদার সরকার গঠিত হলে তাদের সঙ্গে কাজ করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক সহজ হবে।
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এই নির্বাচন নিয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, তিনি নেতানিয়াহুকে আক্রমণও করছেন না আবার সমর্থনও দিচ্ছেন না; এখানে প্রেসিডেন্টের অবস্থানই চূড়ান্ত। এর আগে হাঙ্গেরির নির্বাচনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবানের পক্ষে অবস্থান নেয়ার পর তিনি পরাজিত হওয়ায় বিদেশি নির্বাচনে আর না জড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ভ্যান্স। মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাতে জানা যায়, ইরান যুদ্ধের সময় হোয়াইট হাউসকে দেয়া নেতানিয়াহুর বিভিন্ন পূর্বাভাস ভুল প্রমাণিত হওয়ায় ভ্যান্সসহ শীর্ষ উপদেষ্টারা তার ওপর আস্থা হারিয়েছেন।
এছাড়া ট্রাম্পের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জামাতা জ্যারেড কুশনার গাজা শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নিতে নেতানিয়াহুর অনীহার কারণে ক্ষুব্ধ। সিরিয়া বিষয়ক মার্কিন দূত টম ব্যারাক দামেস্কের প্রতি নেতানিয়াহু সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং সিরিয়ায় লাগাতার ইসরাইলি সামরিক অভিযান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর দলও ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে নেতানিয়াহুর ব্যর্থতায় অসন্তোষ জানিয়েছে।
নির্বাচনের পর ট্রাম্প প্রশাসনকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা নেতানিয়াহুর সঙ্গে মিলে ইরানে নতুন করে বড় সামরিক অভিযান চালাবে কি না। এছাড়া লেবানন ও সিরিয়ার সঙ্গে চুক্তি এবং সৌদি আরবের সঙ্গে ইসরাইলের ঐতিহাসিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনও ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
ইসরাইলের ১২০ আসনের পার্লামেন্ট নেসেটের নির্বাচনে তিনটি প্রধান টিভি চ্যানেলের চূড়ান্ত জনমত জরিপে দেখা গেছে, নেতানিয়াহুর জোট ৫০টি আসন পেতে পারে, যা তাদের বর্তমান আসনসংখ্যার চেয়ে ১৭টি কম। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেতে পারে ৫২ থেকে ৫৬টি আসন এবং দুটি আরব দল পেতে পারে ১৪ থেকে ১৬টি আসন। কট্টরপন্থি চ্যানেল ১৪ নেতানিয়াহুর জোটকে ৬০টি আসন দিলেও কোনো পক্ষেরই সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন নিশ্চিত করার স্পষ্ট সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। কোনো দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে দেশটিতে ফের অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে এবং নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব চালিয়ে যেতে পারেন।
নির্বাচনের ঠিক তিন দিন আগে শনিবার রাতে তেলআবিবের হোস্টেজ স্কয়ারে নেতানিয়াহুর পদত্যাগের দাবিতে হাজার হাজার মানুষ বিশাল সমাবেশ করেছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলায় নিহত ও জিম্মিদের পরিবারের সংগঠন অক্টোবর কাউন্সিলের ডাকে এই সমাবেশে বিরোধীদলীয় নেতা ইয়াইর লাপিদ, আভিগদোর লিবারম্যান ও ইয়াইর গোলান উপস্থিত ছিলেন। তারা ঘোষণা দেন, আগামী নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সত্য উদঘাটনে রাষ্ট্রীয় তদন্ত কমিশন গঠন করা হবে। বিক্ষোভকারীরা জানান, চার বছরে দেশের ভাবমূর্তি তলানিতে নিয়ে গেছেন নেতানিয়াহু। সমাবেশ চলাকালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের নিরাপত্তা দলের ওপর হামলার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে লিকুদ দলের দাবি সত্ত্বেও সমাবেশটির সরাসরি সম্প্রচার বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিটি।





