নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ফ্রান্স জ্বলছে! সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি জগৎ থেকে আসা এবং হৃদয়ে ঘৃণা পোষণকারী মানুষের অভিবাসন একসময়ের মহান এই দেশটিকে চুরমার করে দিয়েছে। দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই নিজেদের সীমান্ত বন্ধ করুন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিন!’
এর আগে একই ধরনের মন্তব্য করেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লেখেন, ‘বৈচিত্র্য ও সহানুভূতির নামে পশ্চিমা উদারপন্থিরা ফ্রান্সসহ অন্যান্য দেশে তৃতীয় বিশ্বকে ডেকে এনেছে। তারা সমাজের সঙ্গে তাদের মিশে যাওয়া ও খাপ খাইয়ে চলার মৌলিক প্রশ্নগুলোকে পুরোপুরি উপেক্ষা করেছে।’
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জরুরি পদক্ষেপ নিতে মন্ত্রিসভার সঙ্গে বৈঠকের পর জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেয়ার কথা রয়েছে ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁর। তবে ট্রাম্পের এই মন্তব্যের বিষয়ে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানাননি তিনি। প্রেসিডেন্ট হিসেবে ম্যাক্রোঁর মেয়াদের আর মাত্র ছয় মাস বাকি থাকতে এই অস্থিরতা তার রাজনৈতিক ভাবমূর্তিকে চরম সংকটে ফেলেছে এবং দেশকে গভীর বিভক্তির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
গতকাল শনিবার ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকসংকট ও জরাজীর্ণ পরিবেশ এবং নাগরিক পরিষেবাগুলোর অবনতির প্রতিবাদে ডাকা শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ হঠাৎ করেই চরম সহিংসতা ও বিশৃঙ্খলায় রূপ নেয়। একপর্যায়ে মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা মূল রাজনৈতিক কর্মসূচিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করে। তারা বিভিন্ন বিলাসবহুল পণ্যের দোকান, প্রযুক্তিপণ্যের শোরুম ও মুদি দোকানে হামলা চালাতে শুরু করে। পুরো প্যারিসের রাস্তাগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে ভাঙা কাচ আর ধ্বংসাবশেষ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ভাঙচুর হওয়া একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে এক নারী লুটতরাজ বন্ধ করতে মিনতি জানাচ্ছেন। চিৎকার করে তিনি বলছিলেন, ‘আপনারা কেন এমনটা করছেন? থামুন! কেন করছেন এসব? এটা তো কোনো সমাধান নয়।’ কিন্তু দুর্বৃত্তরা তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে দোকানের তাক ভেঙে মালামাল ও পানীয় লুট করে নিয়ে যায়।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ব্যর্থ হওয়ায় ডিওরের মতো বিশ্ববিখ্যাত বিলাসবহুল ফ্যাশন হাউসগুলো নিজেদের দোকান পাহারা দিতে নিজস্ব সশস্ত্র নিরাপত্তা রক্ষী মোতায়েন করে। ফরাসি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনিয়েজ আজ রোববার জানিয়েছেন, সারা দেশে সহিংসতার ঘটনায় এ পর্যন্ত ১ হাজার ৮০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও শিক্ষার্থীদের সমন্বয়ে গঠিত ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের ব্যানারে ডাকা এই কর্মসূচিতে দেশজুড়ে প্রায় আট লাখ মানুষ অংশ নেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মধ্য ফ্রান্সের লিমোজেস শহরে বিক্ষোভকারীদের দেয়া আগুনে পুড়ে ঐতিহাসিক টাউন হলের ঘড়ির চূড়া ধসে পড়ে। ১৪৩ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনার ছাদের একটি অংশও ধসে গেছে।
তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়েছে রাজধানী প্যারিস। মুখোশধারী দুর্বৃত্তরা ব্যারিকেড ভেঙে জোরপূর্বক বিভিন্ন দোকানে ঢুকে মোবাইল ফোন, ওষুধ এবং মূল্যবান সামগ্রী লুট করে নিয়ে যায়। বিখ্যাত পোশাক ব্র্যান্ড ল্যাকোস্টের মূল প্রতিষ্ঠান মাউস-এর প্রধান নির্বাহী থিয়েরি গিবার্ট বলেন, ‘ফ্রান্সজুড়ে অন্য অনেক ব্যবসার মতো যখন আমাদের ল্যাকোস্ট এবং এইগল শোরুমগুলো লুট হয়, তখন শুধু কাচের শোকেসটাই ভাঙে না। বরং কর্মসংস্থান, বছরের পর বছর ধরে করা মানুষের পরিশ্রম, দক্ষতা এবং হাজারো কর্মীর নিষ্ঠা ঝুঁকির মুখে পড়ে।’
আজ রোববার সকালে প্যারিসের মেয়র এমানুয়েল গ্রেগোয়ার ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, পুরো শহরের বহু সড়ক পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়েছে। প্যারিস সেন্টারের মেয়র আরিয়েল ওয়েল এই পরিস্থিতিকে নগরীর কেন্দ্রস্থলের ইতিহাসে নজিরবিহীন বলে আখ্যা দিয়ে জানান, অতীতে ইয়েলো ভেস্ট আন্দোলনের চরম উত্তাল দিনগুলোতেও শহর এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি।
প্যারিসের রাজপথে অসহায় ব্যবসায়ীদের হাহাকার দেখা গেছে। লুট হয়ে যাওয়া একটি টেলিকম দোকানের সিঁড়িতে মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকতে দেখা যায় এক দোকানদারকে। অন্য একটি ভিডিওতে দেখা যায়, এক ব্যবসায়ী লুটতরাজ থামানোর জন্য আকুতি জানাচ্ছেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত রাস্তার ওপারের একটি পার্লারের আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজের চোখের সামনে নিজের মোবাইল ফোনের দোকান লুট হতে দেখতে বাধ্য হন তিনি।
প্যারিসের ব্যবসায়ী ও কারিগর ফেডারেশনের সভাপতি থিয়েরি ভেরন সংবাদমাধ্যম ফ্রান্স ইনফোকে বলেন, এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ফ্রান্সের যে ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে, তাতে তিনি লজ্জিত। তিনি বলেন, ‘আমরা ভয়াবহ পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছি। এটি চরম লজ্জাজনক। প্রধান প্রধান ইউরোপীয় শহরগুলোর প্রতিনিধিরা যখন জিজ্ঞেস করেন ফ্রান্সে আসলে কী ঘটছে, তখন আমাদের মাথা হেঁট হয়ে যায়। এটি এক অবিশ্বাস্য বিপর্যয়।’
এদিকে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও মার্কিন প্রশাসনের মধ্যে সংযোগকারী হিসেবে পরিচিত কিরিল দিমিত্রিয়েভও জেডি ভ্যান্সের সুরে সুর মিলিয়ে বলেন, ‘বামপন্থি বিশ্বায়নবাদীরা অভিবাসনকে উসকে দিয়ে এ ধরনের নৈরাজ্য তৈরি করছে।’
এই সহিংসতা ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও তীব্র বাগ্যুদ্ধের জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়ান ল্যাকরনু এবং কট্টর বামপন্থি দল ফ্রান্স আনবাউডের নেতা ও প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী জঁ-লুক মেলঁশোঁ পরস্পরের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেয়ার অভিযোগ তুলেছেন। মেলঁশোঁর দলের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দায়িত্বজ্ঞানহীনতার অভিযোগ তোলেন ল্যাকরনু। জবাবে মেলঁশোঁ প্রধানমন্ত্রীকে করুণ রাজনীতিবিদ আখ্যা দিয়ে বলেন, সরকারের চরম ব্যর্থতা এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের কৌশলগত অযোগ্যতাই এই বিশৃঙ্খলার জন্য দায়ী।
অন্যদিকে কট্টর ডানপন্থি ন্যাশনাল র্যালির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মারিন লো পেন দাঙ্গাকারীদের কঠোর নিন্দা জানিয়ে বলেন, ফ্রান্স আনবাউড দল সহিংসতার বৈধতা দিয়েছে। উগ্র বামপন্থিদের হাত থেকে ফরাসি জনগণকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। ব্রিটিশ ঐতিহাসিক সাইমন শামা মন্তব্য করেছেন, ফ্রান্সে চলমান এই ব্যাপক সহিংসতা আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মারিন লো পেনের জয়ের পথকে কার্যত নিশ্চিত করে তুলল।





