জেটচালিত ড্রোন হামলা বাড়াতে ইউক্রেন সীমান্তের কাছে রাশিয়ার নতুন ঘাঁটি

রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলের মিলেরোভোর কাছে বড় ড্রোন উৎক্ষেপণকেন্দ্র নির্মাণের কাজ
রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলের মিলেরোভোর কাছে বড় ড্রোন উৎক্ষেপণকেন্দ্র নির্মাণের কাজ | ছবি: রয়টার্স
0

ইউক্রেন সীমান্তের কাছে মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যে জেটচালিত ড্রোন উৎক্ষেপণের জন্য বিশাল একটি সামরিক ঘাঁটির নির্মাণকাজ প্রায় শেষ করে এনেছে রাশিয়া। প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং রয়টার্সের বিশ্লেষণ করা স্যাটেলাইট চিত্রে এমন তথ্য উঠে এসেছে।

বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান প্ল্যানেট ল্যাবস ও এয়ারবাসের সরবরাহ করা ছবিতে দেখা যায়, গত ৩১ আগস্টেও রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রোস্তভ অঞ্চলের ওই স্থানটি ছিল পুরোপুরি ফাঁকা মাঠ। কিন্তু বুধবার তোলা ছবিতে দেখা গেছে, সেখানে প্রায় ১২৬টি ফুটবল মাঠের সমান আয়তনের একটি সুবিশাল স্থাপনা গড়ে তোলা হয়েছে, যার মোট আয়তন প্রায় শূন্য দশমিক ৯ বর্গকিলোমিটার।

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার জেটচালিত আক্রমণাত্মক ড্রোনের ব্যবহার ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই ঘাঁটির নির্মাণকাজ শেষ হলো। ঘণ্টায় ৬০০ কিলোমিটার বেগে ছুটে চলা এসব দ্রুতগতির ড্রোন প্রতিহত করতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছে কিয়েভ। পাঁচ বছরে গড়ানো এই পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে আসন্ন শীত মৌসুমে রাশিয়া ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আরও বাড়াবে বলে আশঙ্কা করছে ইউক্রেন।

বেসরকারি গোয়েন্দা প্রতিষ্ঠান ড্রোনসেকের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী মাইক মনিক জানান, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখতে পাওয়া এই ঘাঁটি থেকে রাশিয়ার সর্বাধুনিক গেরান-৪ ও গেরান-৫ মডেলের জেটচালিত ড্রোন উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, স্থাপনার পশ্চিম প্রান্তে এসব ড্রোন ছোড়ার উপযোগী আটটি লঞ্চিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা হয়েছে। ইউক্রেনে হামলার জন্য রাশিয়ার হাতে এরই মধ্যে অন্তত ১১টি স্থায়ী উৎক্ষেপণ কেন্দ্র রয়েছে, যার সঙ্গে নতুন করে এটি যুক্ত হতে যাচ্ছে।

মনিক বলেন, ‘নির্মাণকাজের এই গতি প্রমাণ করে যে রাশিয়া কত দ্রুত তাদের প্রতিষ্ঠিত আক্রমণাত্মক সক্ষমতাকে কাজে লাগাতে পারে।’ তিনি জানান, ঘাঁটিটি পুরোপুরি চালু হতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বা তারও কম সময় লাগতে পারে। সরবরাহ ব্যবস্থা ও লক্ষ্যমাত্রা ঠিক থাকলে এই ঘাঁটি থেকে ২৪ ঘণ্টায় ১০০টি বা তারও বেশি জেটচালিত ড্রোন ছোড়া সম্ভব।

রাশিয়া ও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতির সময়েই এই ঘাঁটি তৈরি হলো। ইউরোপীয় দেশগুলোর অভিযোগ, মস্কো তাদের বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাত, ড্রোন অনুপ্রবেশ ও সাইবার হামলা জোরদার করেছে। মনিক সতর্ক করে বলেন, একদিকে জেটচালিত ড্রোনের শিল্প উৎপাদন ও তাদের আধুনিকায়ন, অন্যদিকে ন্যাটোভুক্ত অনেক দেশের ড্রোন প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতা পশ্চিমাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। তিনি বলেন, ‘এত দ্রুত বড় আকারের ড্রোন হামলা চালানোর সক্ষমতা তৈরি করা ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর জন্য কৌশলগত ঝুঁকি।’

লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রুসির প্রোগ্রাম ডিরেক্টর রব জর্ডান বলেন, স্যাটেলাইট চিত্রে দেখতে পাওয়া কংক্রিটের প্যাড ও দুটি সম্ভাব্য টেকঅফ রেল রাশিয়ার গেরান ড্রোনের উৎক্ষেপণ ট্র্যাকের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তিনি বলেন, ‘এত অল্প সময়ে এই মাপের নির্মাণকাজ সত্যিই অভাবনীয়। এটি প্রমাণ করে যে রাশিয়া তাদের প্রচলিত স্থলবাহিনীর চেয়ে দূরপাল্লার হামলার সক্ষমতার ওপর বেশি আস্থা রাখছে।’

সামরিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, ইউক্রেন প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় রাশিয়া তাদের ড্রোন উৎপাদন ব্যবস্থা পুরোপুরি জেটচালিত মডেলের দিকে সরিয়ে নিয়েছে। চলতি গ্রীষ্মের তিন মাসে জেটচালিত ড্রোনের ব্যবহার প্রায় ছয় গুণ বাড়িয়েছে মস্কো, যার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে কিয়েভ ও তার আশপাশের অঞ্চল। ইউক্রেনের নিজস্ব প্রযুক্তিতে বানানো সস্তা ইন্টারসেপ্টর ড্রোনগুলো পুরোনো পিস্টনচালিত ড্রোন ধ্বংসে কার্যকর হলেও নতুন জেটচালিত ড্রোনের গতির কাছে তা হার মানছে।

নতুন এই ঘাঁটিটি রাশিয়ার মিলেরোভো বিমানঘাঁটি থেকে মাত্র সাড়ে তিন কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। ড্রোনসেক জানিয়েছে, বিমানঘাঁটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সুরক্ষা বলয়ের মধ্যে থাকায় ইউক্রেনের পক্ষে এই নতুন স্থাপনায় হামলা চালানো কঠিন হবে। এ বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এএম