ইরানের সঙ্গে চুক্তিতে ওয়াশিংটনের নতুন শর্ত; সমঝোতার ইঙ্গিত নাকি নতুন চাপ?

জেডি ভ্যান্স
জেডি ভ্যান্স | ছবি: গার্ডিয়ান
0

যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে ইরানকে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। বিশেষজ্ঞদের মতে, তেহরানের সব ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সম্পূর্ণ বন্ধ করার আগের কঠোর অবস্থান থেকে ওয়াশিংটন কিছুটা নমনীয় হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে মার্কিন শীর্ষ কর্মকর্তাদের কঠোর অবস্থান এবং তেহরানের গভীর অনাস্থার কারণে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের অষ্টম মাসে এসেও একটি টেকসই চুক্তির পথে বড় ধরনের বাধা রয়ে গেছে।

যুক্তরাষ্ট্রের নতুন দাবি কী?
বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, পরমাণু অস্ত্র না বানানোর প্রতিশ্রুতি প্রমাণ করতে ইরানকে তাদের সমৃদ্ধকরণ কার্যক্রমে পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, ‘যদি আপনারা পরমাণু অস্ত্র না-ই চান, তবে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত সমৃদ্ধ জ্বালানির কী প্রয়োজন? পরমাণু অস্ত্র তৈরি না করার অঙ্গীকার দেখাতে উচ্চমাত্রার জ্বালানি তৈরি বন্ধ করুন। এটি অত্যন্ত মৌলিক একটি বিষয়।’

ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মাধ্যমে তা পরমাণু চুল্লির জ্বালানি এবং উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ করে পরমাণু অস্ত্র তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ) জানিয়েছে, ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করেছে, যা অস্ত্র তৈরির উপযোগী ৯০ শতাংশের কিছুটা নিচে। তবে ২০২৫ সালের মে মাসের মূল্যায়নে সংস্থাটি জানায়, তেহরান কোনো সুনির্দিষ্ট পরমাণু অস্ত্র কর্মসূচি চালাচ্ছে এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি।

ভ্যান্স আরও জানান, মার্কিন প্রশাসন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচির সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে অ্যাথেন্সে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও স্পষ্ট করে বলেন, ‘ইরান কোনোভাবেই পরমাণু অস্ত্র পেতে পারে না—খুব সাধারণ কথা, এখানেই শেষ।’ একই সঙ্গে তিনি দাবি করেন, তেহরান হরমুজ প্রণালির ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে এবং তাদের অর্থনীতি চরম পতনের মুখে পড়েছে।

ইরান কী বলছে?
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ওয়াশিংটনের সঙ্গে যেকোনো আলোচনাকে অর্থহীন বলে মন্তব্য করেছেন। আর্মেনিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠককালে তিনি অভিযোগ করেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের সমস্যা হল, প্রতিবার আমরা আলোচনার টেবিলে বসলেই আমাদের ওপর যুদ্ধ চাপিয়ে দেয়া হয়।’ ইরানের অফিশিয়াল বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে তিনি আরও বলেন, ‘তারা আলোচনার পর এ পর্যন্ত আমাদের ওপর তিনবার আক্রমণ করেছে। এটি প্রমাণ করে তারা আলোচনা চায় না, বরং ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানকে উৎখাত করাই তাদের লক্ষ্য।’

তবে গত ৪ অক্টোবর তেহরানে বিদেশি রাষ্ট্রদূতদের উদ্দেশ্যে দেয়া বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, ‘কেবল ন্যায় ও সততার ওপর ভিত্তি করে হওয়া আলোচনাই’ সংঘাতের অবসান ঘটাতে পারে। এর আগে সেপ্টেম্বরের শেষে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়া ও আলোচনা পুনরায় শুরুর বিষয়ে ইরানের একটি প্রস্তাব মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।

আগের প্রস্তাবগুলোর সঙ্গে পার্থক্য কোথায়?
ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবটি মূলত গত ১৭ জুনে স্বাক্ষরিত দুই দেশের সমঝোতা স্মারকের ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুত করা হয়েছিল। নতুন প্রস্তাবে বলা হয়—লেবাননসহ সব ফ্রন্টে অবিলম্বে সংঘাত বন্ধ করতে হবে, যুক্তরাষ্ট্রকে তাদের নৌ অবরোধ ও তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে এবং ইরানের অবরুদ্ধ অর্থ ফেরত দিতে হবে। এর বিনিময়ে সাত দিন পর হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেয়া হবে এবং পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হবে।

ল্যাঙ্কাস্টার ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক সিমন মাবন বলেন, ওয়াশিংটন পরমাণু ইস্যুতে বেশি জোর দিলেও তেহরানের মূল অগ্রাধিকার সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু ইস্যুতে অবস্থান কিছুটা নমনীয় করার চেষ্টা করছে, কিন্তু ইরানিদের কাছে এটি প্রধান সমস্যা নয়। তাদের প্রধান দাবি হল নৌ অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, আটকে থাকা অর্থ ছাড় এবং পুরো অঞ্চলের সংঘাতের অবসান।’

চুক্তির পথে অন্যান্য বাধা কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির মতো কোনো সমঝোতায় পৌঁছাতে হলে তেহরানকে পরমাণু বিষয়ের বাইরে গিয়েও অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার সুনির্দিষ্ট নিশ্চয়তা দিতে হবে।

এ ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এখনো একটি বড় প্রশ্ন। যদিও সামুদ্রিক গোয়েন্দা সংস্থা কেপলারের তথ্যমতে সেপ্টেম্বর মাসে উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব সময়ের ৮১ শতাংশ পুনরুদ্ধার হয়েছে, তবুও নিয়মিত হামলা থামেনি। মঙ্গলবারও হরমুজ প্রণালিতে একটি তেল ট্যাংকারে প্রজেক্টাইল হামলায় ১২ জন ক্রু আহত হয়েছেন।

অধ্যাপক মাবন উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি বাণিজ্যিক চলাচলের জন্য পুরোপুরি নিরাপদ কি না, সে বিষয়ে ওয়াশিংটন এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি বলেই সমৃদ্ধকরণ বিষয়ে তুলনামূলক নমনীয় বার্তা দিচ্ছে।

এএম