যুদ্ধবিরতির মধ্যেও চলছে হামলা, তিন বছরে গাজায় নিহত প্রতি ৩০ জনে একজন

গাজায় ঘুড়ি উড়াচ্ছে এক শিশু
গাজায় ঘুড়ি উড়াচ্ছে এক শিশু | ছবি: সংগৃহীত
0

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের নির্বিচার আগ্রাসনের তিন বছর পূর্ণ হল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাসের সামরিক শাখা আল-কাসাম ব্রিগেড ও অন্যান্য ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের হামলার পর থেকে উপত্যকাটিতে অবিরাম সামরিক অভিযান চালিয়ে আসছে ইসরাইল। টানা তিন বছরের হামলায় গাজা এখন এক ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেয়া, হাজার হাজার মানুষের প্রাণহানি এবং মৌলিক সেবাগুলো পুরোপুরি ভেঙে পড়ার মধ্য দিয়ে উপত্যকাজুড়ে তৈরি হয়েছে শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়।

প্রতি ৩০ জনে একজনের মৃত্যু
গত তিন বছরে ইসরাইলি হামলায় গাজায় অন্তত ৭৪ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে শিশুর সংখ্যাই অন্তত ২১ হাজার। অর্থাৎ উপত্যকার যুদ্ধপূর্ব জনসংখ্যার প্রতি ৩০ জনের মধ্যে একজনের প্রাণ গেছে, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩ শতাংশ। ফিলিস্তিনের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কেবল হাসপাতালে আনা বা আনুষ্ঠানিকভাবে নিবন্ধিত মরদেহগুলোর হিসাব প্রকাশ করে। ফলে ধ্বংসস্তূপের নিচে নিখোঁজ হাজার হাজার মানুষকে হিসাবে নিলে প্রকৃত প্রাণহানির সংখ্যা আরও অনেক বেশি।

একই সঙ্গে আহত হয়েছেন ১ লাখ ৭৫ হাজারের বেশি মানুষ, যা উপত্যকার প্রতি ১৩ জনের মধ্যে একজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাব অনুযায়ী, আহতদের অন্তত ২৪ শতাংশের এমন মারাত্মক অঙ্গহানি বা ক্ষত হয়েছে যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন প্রয়োজন। আর এদের এক-চতুর্থাংশই শিশু। প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসামগ্রী ও ওষুধের তীব্র ঘাটতিতে অবশিষ্ট কয়েকটি হাসপাতালও রোগীদের সেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে।

নামমাত্র যুদ্ধবিরতি ও অবিরাম হত্যাযজ্ঞ
২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকরের ঘোষণা দেয়া হলেও তা উপত্যকায় শান্তি ফেরাতে পারেনি। প্রায় প্রতিদিনই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করে হামলা চালিয়েছে ইসরাইল। আল জাজিরার এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে গত ৩৬১ দিনের মধ্যে ৩২৫ দিনই গাজায় হামলা চালানো হয়েছে। এই সময়ে মাত্র ৩৬ দিন এমন ছিল যেদিন কোনো হামলা, মৃত্যু বা আহতের ঘটনা ঘটেনি। তথাকথিত যুদ্ধবিরতি চলাকালেই ইসরাইলি বাহিনীর হাতে অন্তত ১ হাজার ৪৬০ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৫ হাজার ১১৬ জন আহত হয়েছেন। অথচ যুক্তরাষ্ট্র এখনো দাবি করে আসছে যে যুদ্ধবিরতি বহাল রয়েছে।

৯৪ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত
গাজার স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ওপর নজিরবিহীন আঘাত হেনেছে ইসরাইল। জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয়কারী দপ্তর ওচা (OCHA)-এর তথ্য অনুযায়ী, উপত্যকার ৯৪ শতাংশ হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্র আংশিক বা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সেখানে থাকা ৬৬৬টি স্বাস্থ্য স্থাপনার মধ্যে বর্তমানে মাত্র ৪২টি কোনোমতে চালু রয়েছে। চতুর্থ জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) রোম সংবিধি অনুযায়ী হাসপাতালে পরিকল্পিত হামলা একটি সুস্পষ্ট যুদ্ধাপরাধ।

পানি সংকট ও বাড়িঘর ধ্বংস
গাজার ৯১ শতাংশ পরিবার তীব্র পানি সংকটে দিন কাটাচ্ছে। ইসরাইলি বাহিনী সুপেয় পানির কূপ, সরবরাহ পাইপলাইন, লবণাক্ততা দূরীকরণ প্ল্যান্ট ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা পরিকল্পিতভাবে ধ্বংস করেছে। বর্তমানে গাজার অর্ধেক মানুষ রান্না ও পানের জন্য দৈনিক ৬ লিটারের কম পানি ব্যবহার করতে পারছে, যেখানে জরুরি অবস্থায় বেঁচে থাকার জন্য একজন মানুষের দৈনিক ন্যূনতম ২০ লিটার পানির প্রয়োজন হয়।

উপত্যকার মোট অবকাঠামোর প্রায় ৮২ শতাংশ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। পুরো এলাকা ধ্বংসস্তূপে রূপ নেয়ায় গাজার প্রায় ১৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন, যা মোট জনসংখ্যার ৯০ শতাংশ।

ভেঙে পড়েছে শিক্ষাব্যবস্থা, নিহত তিন শতাধিক সাংবাদিক
গাজার শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ধসে পড়েছে। ওচা জানিয়েছে, সেখানকার প্রায় ৯৩ শতাংশ স্কুল পুরোপুরি পুনর্নির্মাণ ছাড়া ব্যবহারের অনুপযোগী। ফলে ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা থেকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত। এ ছাড়া অন্তত ৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবন ধ্বংস করা হয়েছে এবং অবশিষ্ট ভবনগুলো বাস্তুচ্যুত পরিবারগুলোর অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

অন্যদিকে পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে সাংবাদিকদের জন্য গাজা পরিণত হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বিপজ্জনক স্থানে। শিরিন আবু আকলেহ অবজারভেটরির তথ্যমতে, গত তিন বছরে গাজায় প্রায় ৩০০ সাংবাদিক ও গণমাধ্যমকর্মী নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে আল জাজিরার ১২ জন গণমাধ্যমকর্মী রয়েছেন। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীন প্রবেশাধিকার নিষিদ্ধ করে নিজেদের সেনাদের নিয়ন্ত্রণে সীমিত কিছু গণমাধ্যমকর্মীকে গাজায় প্রবেশের অনুমতি দেয় ইসরাইল।

—আল জাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে

এএম