জ্বালানির এমন মূল্যবৃদ্ধি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন ও রিপাবলিকান আইনপ্রণেতাদের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ডিজেল রপ্তানি সীমিত করার বিষয়টি ভাবিয়ে তুলেছে। বিশ্ববাজারে সবচেয়ে বড় ডিজেল রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র যদি সত্যিই রপ্তানি বন্ধ করে, তবে এর প্রভাব আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ বাজারে কেমন হতে পারে—তা নিয়ে জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতামত বিশ্লেষণ করেছে আল জাজিরা।
ডিজেলের দাম এত বেশি কেন?
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষ ডিজেল রপ্তানিকারক হলেও পণ্যটি বৈশ্বিক বাজারে লেনদেন হয়। রাশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল শোধনাগারগুলোতে সংকট তৈরি হওয়ায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানির প্রাপ্যতা কমেছে। ফলে সেই ঘাটতি মেটাতে মার্কিন উৎপাদকদের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। যেমন—ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় রাশিয়ার বড় বড় শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উৎপাদন ব্যাহত হয়েছে।
সেন্টার ফর আ নিউ আমেরিকান সিকিউরিটির সিনিয়র অ্যাডজাঙ্কট ফেলো র্যাচেল জিম্বা আল জাজিরাকে বলেন, ‘মার্কিন শোধনাগারগুলো সর্বোচ্চ সক্ষমতায় কাজ করলেও বিশ্বব্যাপী ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে।’
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও ডিজেলের মজুত কমছে। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্যমতে, গত ১১ সেপ্টেম্বর নাগাদ দেশটিতে ডিজেলের মজুত নেমে এসেছে ১০ কোটি ৭৯ লাখ ব্যারেলে, যা গত চার দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। আন্তর্জাতিক বাজারে চড়া মূল্যের সুযোগ নিতে গিয়ে মার্কিন উৎপাদকেরা বিদেশে বিক্রিতে আগ্রহী হওয়ায় অভ্যন্তরীণ বাজারেও চাপ বাড়ছে।
রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কথা কেন ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র?
যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়া আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্স ও ইপসোসের সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৪৭ শতাংশ ভোটার জীবনযাত্রার ব্যয়কে নির্বাচনের প্রধান নিয়ামক হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এ ছাড়া অর্থনীতি ব্যবস্থাপনায় রিপাবলিকানদের তুলনায় ডেমোক্র্যাটদের ওপর বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন ভোটাররা।
এ পরিস্থিতিতে রিপাবলিকান আইনপ্রণেতারা অভ্যন্তরীণ বাজারে দাম কমাতে সাময়িক বা পূর্ণাঙ্গ রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার দাবি তুলেছেন। আইওয়ার রিপাবলিকান সিনেটর চাক গ্রাসলি নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আলাস্কার সিনেটর ড্যান সুলিভানও শীতের আগে মজুত বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছেন। হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভে এ সংক্রান্ত দুটি বিলও উত্থাপন করা হয়েছে।
মার্কিন জ্বালানি মন্ত্রী ক্রিস রাইট জানিয়েছেন, তিনি তেল শোধনাগারগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য স্বেচ্ছামূলক রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের বিষয়ে আলোচনা করছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এমন পদক্ষেপের পক্ষে ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, তারা সব বিকল্প মূল্যায়ন করছে।
নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে কী ঘটবে?
গবেষণা ও পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির বিশ্লেষকদের মতে, ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করলে মার্কিন স্টোরেজগুলো দ্রুত পূর্ণ হয়ে যাবে। কিন্তু এর নেতিবাচক দিক হলো, অতিরিক্ত মজুতের কারণে শোধনাগারগুলো অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণ কমাতে বাধ্য হবে। এতে বিশ্ববাজারে, বিশেষ করে ল্যাটিন আমেরিকা ও ইউরোপে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে।
প্রতিষ্ঠানটির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কেবল চীনের হাতেই তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদন বাড়িয়ে এ ঘাটতি মেটানোর সক্ষমতা আছে। তবে চীন এতে যুক্ত না-ও হতে পারে।
এসঅ্যান্ডপি গ্লোবালের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, পূর্ণাঙ্গ নিষেধাজ্ঞা দিলে দৈনিক প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল উৎপাদন কমতে পারে, যা বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রকে উল্টো পেট্রোল আমদানিকারক দেশে পরিণত করতে পারে।
গ্যাসবাডির প্রধান পেট্রোলিয়াম বিশ্লেষক প্যাট্রিক ডি হান বলেন, ‘ডিজেল ভুট্টার মতোই বিশ্ববাজারে বিক্রি হয়। শোধনাগারগুলোকে কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করলে তারা উৎপাদন কমিয়ে দেবে। আর সরবরাহ কমলে দাম কমার বদলে উল্টো বাড়বে।’
কারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?
রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হলে মার্কিন শোধনাগার ও ভোক্তাদের পাশাপাশি মার্কিন জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলো বিপাকে পড়বে। ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে নতুন উৎসের জন্য অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা করতে হবে, যা বৈশ্বিক দর আরও বাড়িয়ে দেবে।
এছাড়া এয়ারলাইন্স ফর আমেরিকা সতর্ক করেছে যে ডিজেল সংকটের ঢেউ বিমান চলাচল খাতেও লাগতে পারে, যা যাত্রীদের টিকিটের ভাড়া বাড়িয়ে দেবে।
বিশ্লেষকদের সামগ্রিক মত হলো, রপ্তানি সীমিত করে অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি ঠেকানো কঠিন হতে পারে। বরং উৎপাদন কমে গেলে তা হিতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
—আল জাজিরার প্রতিবেদন অবলম্বনে





