হিজবুল্লাহর ঘাঁটিতে ইসরাইলি অভিযান হলে যুক্তরাষ্ট্রকে পাল্টা হামলার হুঁশিয়ারি ইরানের

দক্ষিণ লেবাননের বেউফোর্ট দুর্গ
দক্ষিণ লেবাননের বেউফোর্ট দুর্গ | ছবি: রয়টার্স
0

দক্ষিণ লেবাননের একটি গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় ইসরাইল বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালালে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে শক্তিশালী পাল্টা ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান। রয়টার্সকে এ বিষয়ে অবহিত তিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রকে এই বার্তা দেয় তেহরান।

দক্ষিণ লেবাননের আলি আল-তাহের পাহাড়ে ইরানের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে অবস্থান করছেন বলে ওই কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য, ওই এলাকায় ইসরাইল বড় ধরনের অভিযান চালালে ইরানও বড় পরিসরে হামলা চালাবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে।

লেবাননের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, আলি আল-তাহের পাহাড়ের ভেতরে হিজবুল্লাহ একটি ভূগর্ভস্থ কমান্ড সেন্টার ও অস্ত্রের গুদাম তৈরি করেছে বলে ধারণা করা হয়। দক্ষিণ-পূর্ব লেবাননের ওপর কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিসীমা থাকায় এলাকাটি ইসরাইল ও হিজবুল্লাহর সংঘাতে অন্যতম বিতর্কিত স্থানে পরিণত হয়েছে।

হিজবুল্লাহ প্রকাশ্য বিবৃতিতে জানিয়েছে, পাহাড়টি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানে ইসরাইলি বাহিনী অগ্রসর হলে তারা প্রতিরোধ করবে। সংগঠনটির কর্মকর্তারা সেখানে একটি ‘স্থাপনার’ কথা বলেছেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

ইসরাইলি বাহিনী আলি আল-তাহেরের দক্ষিণে বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে রেখেছে। তারা প্রকাশ্য বিবৃতিতে পাহাড়টিকে নিজেদের ‘প্রধান অভিযানগত লক্ষ্যগুলোর’ একটি হিসেবে উল্লেখ করেছে।

রয়টার্সের প্রশ্নের জবাবে হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা ইরানের বার্তা এবং আলি আল-তাহেরে হামলা না চালাতে যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলের ওপর চাপ দিয়েছে—এমন তথ্যকে সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেছেন। ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর, ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ইসরাইলি সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি।

আলি আল-তাহেরে ইরানের সেনারা

আঞ্চলিক দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ওমানের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইরানের বার্তাটি পৌঁছানো হয়। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ওমান দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগে ভূমিকা পালন করে আসছে।

তেহরানের কাছ থেকে তথ্য পাওয়া ওই দুই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসের এক ডজনের বেশি সদস্য হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের সঙ্গে সেখানে অবস্থান করছেন। তাদের মধ্যে অন্তত দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়েছেন।

তৃতীয় এক কর্মকর্তা, যিনি সরাসরি ওই বার্তার বিষয়ে অবগত, জানিয়েছেন, আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে বার্তাটি দেয়া হয়। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপের কারণে ইসরাইল আলি আল-তাহেরে অভিযান চালানো স্থগিত করেছে বলে দাবি করেছেন তিনি।

হিজবুল্লাহর গণমাধ্যম দপ্তর ইরানের বার্তার সত্যতা নিশ্চিত বা অস্বীকার করেনি। তবে তারা রয়টার্সকে বলেছে, পাহাড়টি নিয়ে এমন সতর্কবার্তা দেয়া হয়ে থাকাটা ‘স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত’।

হিজবুল্লাহর ভাষ্য, দক্ষিণ লেবাননে ইসরাইলের যেকোনো স্থল অভিযান, বিশেষ করে ভূখণ্ড সম্প্রসারণের চেষ্টা, জুনে স্বাক্ষরিত যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা স্মারকের বড় ধরনের লঙ্ঘন। ওই সমঝোতায় লেবাননে যুদ্ধবিরতির বিষয়টি ছিল। জুনের শুরুতে বৈরুতের উপকণ্ঠে হিজবুল্লাহর ওপর হামলার জবাবে ইরান ইসরাইলের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছিল।

হিজবুল্লাহকে অবরুদ্ধ করার চেষ্টা

জুনে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও আলি আল-তাহেরের আশপাশে হিজবুল্লাহ সক্রিয় রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসরাইলি বাহিনী। গত এক সপ্তাহে পাহাড়টির কাছে ইসরাইলি সেনাদের লক্ষ্য করে হিজবুল্লাহ দুবার বিস্ফোরক বহনকারী ড্রোন পাঠিয়েছে বলেও দাবি করেছে তারা।

জুলাইয়ে ইসরাইলি বাহিনী জানায়, আলি আল-তাহেরে ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় যাওয়ার একটি প্রবেশপথের কাছে হিজবুল্লাহর এক যোদ্ধাকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালানো হয়েছে। ওই এলাকায় হিজবুল্লাহর কার্যক্রম বা ইসরাইলি সেনাদের জন্য কোনো হুমকি তারা মেনে নেবে না বলেও জানায় ইসরাইল।

জুনে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছিলেন, আলি আল-তাহেরে হিজবুল্লাহর কয়েকজন যোদ্ধা খাবার ও পানি ছাড়া ভূগর্ভে আটকা পড়েছেন। ইসরাইলের সংবাদপত্র মারিভ বৃহস্পতিবার এক সামরিক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আলি আল-তাহেরে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কোনো সদস্য নেই বলে ইসরাইলি বাহিনী মনে করছে। খাবার ও পানির অভাবে কয়েকজন হিজবুল্লাহ যোদ্ধা মারা গেছেন বলেও সেখানে দাবি করা হয়েছে।

তৃতীয় ওই কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আলি আল-তাহেরে হিজবুল্লাহ ও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের সদস্যদের অবরুদ্ধ করে সেখান থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করছে ইসরাইল। পাহাড়ে খাবার ও পানি পৌঁছানোর জন্য পাঠানো ড্রোনগুলোও তারা গুলি করে নামিয়ে দিচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।

হিজবুল্লাহর গণমাধ্যম দপ্তর বলেছে, গত এক মাসে আলি আল-তাহেরকে অবরুদ্ধ করে সেখানে থাকা ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি অসহনীয় করে তোলার চেষ্টা করেছে ইসরাইল। তবে বড় ধরনের হামলা না চালানোর বিষয়টি কয়েকটি দেশের মাধ্যমে কোনো বার্তা দেয়া হয়ে থাকতে পারে—এমন ধারণাও তারা করছে।

বড় হামলা হলে যুদ্ধ ফের ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা

হিজবুল্লাহর কাছ থেকে তথ্য পাওয়া এক লেবাননি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পাহাড়টির উত্তর দিক দিয়ে সংগঠনটির যোদ্ধারা এখনো নিজেদের অবস্থানে যেতে পারছেন।

আলি আল-তাহেরে সামরিক পরিস্থিতি সম্পর্কে রয়টার্স স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি। ইসরাইলি বাহিনী এলাকাটিকে নিজেদের ঘোষিত নিরাপত্তা অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত করেছে। সেখানে লেবাননের নাগরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ।

ইরানের হুঁশিয়ারির পরও আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আলি আল-তাহের দখলে নিতে ইসরাইলি সামরিক অভিযান হতে পারে বলে জানিয়েছেন ওই লেবাননি কর্মকর্তা এবং দেশটির একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা।

হিজবুল্লাহ বলেছে, আলি আল-তাহেরে বড় ধরনের হামলা হলে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ আবার শুরু হতে পারে। এতে ইসরাইলের উত্তরাঞ্চলের জনবসতিগুলোতেও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সংগঠনটি।

এএম