মস্কোতে মার্কিন সিআইএ প্রধানের গোপন সফর; ইউক্রেন ও ইরান ইস্যুতে সতর্কবার্তা পাঠানোর গুঞ্জন

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ
যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ | ছবি: রয়টার্স
0

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার (সিআইএ) প্রধান জন র‍্যাটক্লিফ গতকাল (মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট) মস্কোতে একটি আকস্মিক ও অঘোষিত সফর করেছেন। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার নতুন সেনা সমাবেশ এবং ইরানের সঙ্গে মস্কোর সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা নিয়ে ক্রেমলিনকে সরাসরি সতর্কবার্তা দিতেই তার এই গোপন সফর বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই সফর নিয়ে ওয়াশিংটন ও ক্রেমলিন বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় আন্তর্জাতিক মহলে নানা জল্পনা তৈরি হয়েছে। ফার্স্ট পোস্টের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল (মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট) রাশিয়ার ভনুকোভো বিমানবন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহিনীর একটি সি-১৭এ গ্লোবমাস্টার-৩ পরিবহন বিমান অবতরণ করার পর এই জল্পনার সূত্রপাত হয়। ফ্লাইট ট্র্যাকিং ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ডের অ্যান্ড্রুজ বিমানঘাঁটি থেকে লাটভিয়ার রিগা হয়ে সরাসরি মস্কোতে পৌঁছায়। কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া রাশিয়ার মাটিতে মার্কিন সামরিক বিমানের অবতরণ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা শুরু হয়। কেউ কেউ রসিকতা করে লেখেন, ‘আমরা হামলার মুখে পড়েছি!’

ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ প্রথমে এই ফ্লাইট সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই বলে জানালেও পরে তিনি ওয়াশিংটন পোস্টকে বলেন, এটি দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে যোগাযোগের অংশ ছিল। পরবর্তীতে সিবিএস নিউজ প্রথম প্রকাশ করে যে ওই বিমানে সিআইএপ্রধান জন র‍্যাটক্লিফ মস্কো সফরে গিয়েছিলেন। ইউক্রেনের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কিয়েভকে এই সফরের বিষয়ে আগেভাগেই জানানো হয়েছিল এবং মার্কিন প্রতিনিধিদল মস্কো ত্যাগ না করা পর্যন্ত সেখানে হামলা স্থগিত রাখতে অনুরোধ করা হয়েছিল।

গত জানুয়ারি মাসের পর ট্রাম্প প্রশাসনের কোনো শীর্ষ কর্মকর্তার এটিই প্রথম মস্কো সফর। এর আগে মার্কিন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার ইউক্রেন শান্তি আলোচনা নিয়ে আলোচনার জন্য প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। এর আগে ২০২১ সালে তৎকালীন সিআইএ পরিচালক উইলিয়াম বার্নস মস্কো সফর করেছিলেন, যার কয়েক মাস পরেই ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। জন র‍্যাটক্লিফ মস্কোতে রাশিয়ার কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সংস্থা এফএসবির কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে পুতিনের সঙ্গে তার দেখা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

যুক্তরাজ্যের সাবেক সামরিক কর্মকর্তা জন ফোরম্যান বলেন, কোনো বড় ধরনের পরিস্থিতি তৈরি না হলে যুক্তরাষ্ট্রের এত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এভাবে অঘোষিত সফরে যান না। মার্কিন গণমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ইউক্রেন ফ্রন্টে রাশিয়ার নতুন করে ৫ লাখ সেনা সমাবেশের প্রস্তুতি এবং ন্যাটো জোটের ঐক্য পরীক্ষা করার পরিকল্পনার খবর পেয়ে সিআইএপ্রধান ক্রেমলিনকে সতর্ক করতে এই সফরে গিয়ে থাকতে পারেন। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ডেপুটি ডিরেক্টর অব ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্স বেথ স্যানার বলেন, ‘আমরা জানি আপনারা কী করার কথা ভাবছেন এবং আপনাদের তা না করাই ভালো হবে’—সরাসরি এমন বার্তা দিতেই এই সফর হয়ে থাকতে পারে।

র‍্যাটক্লিফের এই সফরের আরেকটি বড় কারণ হতে পারে ইরান যুদ্ধ। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুগুলোতে হামলা চালাতে ইরানকে গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে রাশিয়া। এ ছাড়া ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সঙ্গে বাণিজ্য চালানো দেশগুলোর ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের যে নীতি নিয়েছে, তার আওতায় রাশিয়ার সঙ্গে ইরানের বাণিজ্যও একটি বড় ইস্যু। তাই ইরানকে সামরিক বা গোয়েন্দা সহায়তা বন্ধ করতে রাশিয়াকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দেয়া এই সফরের অন্যতম উদ্দেশ্য হতে পারে।

এ ছাড়া রাশিয়ায় বন্দি মার্কিন নাগরিকদের মুক্তির বিষয়টিও এই সফরের অন্যতম এজেন্ডা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর আগে ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের সাংবাদিক ইভান গেরশকোভিচ, সাংবাদিক আলসু কুরমাশেভা, সাবেক মার্কিন মেরিন পল হুইলান এবং রুশ-মার্কিন নাগরিক কসেনিয়া কারেলিনাসহ বেশ কয়েকজন মার্কিন নাগরিকের মুক্তিতে সিআইএ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।

এএম