সীমান্তরক্ষীদের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, স্পেন সরকার এই সতর্কবার্তায় কান দেয়নি এবং সামান্য ব্যবস্থাই নিয়েছে। গত ২৯ জুন প্রকাশিত স্পেনের একটি আদালতের রায়ে বলা হয়েছিল, সেউতায় ঢোকার সময় অভিবাসীরা যদি কোনো বাস্তব ব্যারিয়ার (বাধা) অতিক্রম করে, একমাত্র তখনই তাদের সঙ্গে সঙ্গে ফেরত পাঠানো যাবে। রায়ে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল, সাঁতরে ছিটমহলটিতে আসা কেউই এই সংজ্ঞায় পড়েন না।
এই রায়ের খবর এবং সেউতায় সফলভাবে ঢোকা অভিবাসীদের ভিডিও দেখে ভাগ্য পরীক্ষা করতে আরও বেশি মানুষ উৎসাহী হয়ে ওঠেন। ২৯ থেকে ৩০ জুলাইয়ের এই প্রাণঘাতী ঢলের জন্য স্পেন সরকার অপরাধী চক্রের ছড়ানো ওই রায় সম্পর্কিত ভুল তথ্যকে দায়ী করেছে।
তবে সীমান্তরক্ষীদের প্রতিনিধিত্বকারী ট্রেড ইউনিয়নগুলোর জারি করা প্রকাশ্য ও গোপন সতর্কবার্তা রয়টার্স পর্যালোচনা করেছে। এতে দেখা গেছে, উত্তর আফ্রিকার এই ছিটমহলে অভিবাসীদের আগমন আরও বাড়তে পারে বলে সপ্তাহখানেক আগেই স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করা হয়েছিল এবং দ্রুত ব্যবস্থা নিতে তাগিদ দেয়া হয়েছিল।
স্প্যানিশ কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, এই ঢলে ৮০ জন প্রাণ হারিয়েছেন এবং মরক্কো কর্তৃপক্ষ তাদের এলাকা থেকে আরও ১৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছে। সব মিলিয়ে নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা ৯৪ জন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বলছে, আরও অনেকেই নিখোঁজ রয়েছেন এবং প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে।
‘বিস্ফোরক ককটেল’
সেউতায় স্পেনের সিভিল গার্ড পুলিশের ট্রেড ইউনিয়ন ‘এইউজিসির’ মুখপাত্র রাশিদ সবিহি বলেন, ৩০ জুলাই যা ঘটেছে, তার পরিধি কেউ কল্পনাও করতে পারেননি। রয়টার্সকে তিনি বলেন, ‘তবে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে এই রায়ের কারণে আরও বেশি অভিবাসী আসবেন। রায়, অপরাধী চক্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মিলিয়ে এটি ছিল একটি বিস্ফোরক ককটেল।’
স্পেন যথাসময়ে ব্যবস্থা নেয়নি বলে করা মন্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে স্পেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জানান, আদালতের রায়ের পর গত ১ আগস্ট সমুদ্রে ভাসমান একটি ব্যারিয়ার বসানোর আগে কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন বিকল্প বিশ্লেষণ করেছিল।
রয়টার্সকে দেয়া লিখিত বিবৃতিতে মুখপাত্র বলেন, ‘আগেভাগে এই মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণের কাজের কারণেই ৩০ জুলাই ব্যাপক আগমনের পর সিদ্ধান্ত নেয়ার মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যেই ভাসমান ব্যারিয়ারটি বসানো সম্ভব হয়েছে।’
‘একটি আইনি ফাঁক’
স্প্যানিশ সীমান্তরক্ষী ইউনিয়নগুলোর পক্ষ থেকে সেউতায় জাতীয় সরকারের প্রতিনিধি এবং ছিটমহলের পুলিশ প্রধানের কাছে লেখা ছয়টি লিখিত বিবৃতি ও চিঠি পর্যালোচনা করেছে রয়টার্স। এতে আদালতের রায়ের পর সরকারের কাছ থেকে দিকনির্দেশনা ও পদক্ষেপ চাওয়া হয়েছিল।
গত ১০ জুলাই ‘এইউজিসি’ সিভিল গার্ড ইউনিয়ন অনলাইনে দেয়া এক বিবৃতিতে বলেছিল, ‘আদালতের এই রায় একটি আইনি ফাঁক তৈরি করেছে; যা সুনির্দিষ্ট প্রটোকল ছাড়া বন্ধ করা সম্ভব নয়।’ সমুদ্রে বাস্তব একটি ব্যারিয়ার না বসানো পর্যন্ত ‘এখন সেই ব্যক্তিদের ওপর নির্ভর করছে, যারা প্রতি রাতে সীমান্তের এজেন্টদের সুস্পষ্ট নির্দেশনা দেবেন।’
তিন দিন পর ১৩ জুলাই এক্সে দেয়া এক পোস্টে পুলিশ ইউনিয়ন ‘এসইউপি’ সতর্ক করে বলেছিল, ‘অপরাধী চক্র প্রতিটি নীতিগত ও আইনি পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে। ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ধীর বা জটিল হয়ে উঠেছে বলে বুঝতে পারলে তারা তাদের পথ ও পদ্ধতি বদলে ফেলে।’ ইউনিয়নটি জনবল বৃদ্ধির পাশাপাশি রায়টির অপব্যবহার এড়াতে ‘সমন্বিত ও কার্যকর’ অভিবাসন নীতির দাবি জানিয়েছিল।
রয়টার্সের হাতে আসা ২৩ জুলাই তারিখের সেউতার পুলিশ প্রধানের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে ইউনিয়নটি উল্লেখ করে, ‘সমুদ্রপথে অবিরাম আগমনের সরাসরি প্রভাব কর্মীদের ওপর পড়ছে। প্রথাগত পুলিশি অবকাঠামো এই পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মতো নয়।’ এতে একটি অস্থায়ী অভ্যর্থনা কেন্দ্র স্থাপনের দাবিও জানানো হয়।
ইউনিয়ন এইউজিসি ও এসইউপির মুখপাত্রদের ভাষ্য অনুযায়ী, পুলিশের জন্য দায়িত্বে থাকা স্পেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সাড়া দেয়নি। সরকারের প্রতিনিধি কয়েক সপ্তাহ পর একটি সাক্ষাতের সময় দিয়েছিলেন।
সেউতার প্রতিনিধির মুখপাত্র বলেছেন, ২৯-৩০ জুলাইয়ের আগে অভিবাসী আগমন বৃদ্ধি এবং পরবর্তী গণ-অতিক্রমের মধ্যে কোনো যোগসূত্র নেই। ইউনিয়নগুলোর অনুরোধ করা বৈঠকে প্রতিনিধি উপস্থিত হতে না পারলেও পুলিশ ও সিভিল গার্ডের সঙ্গে ধারাবাহিক যোগাযোগ রেখেছেন বলে তারা জানান। প্রতিনিধির সঙ্গে কী ধরনের আলোচনা হয়েছিল, তা নিশ্চিত করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে পুলিশ ও সিভিল গার্ডের মুখপাত্ররা। পুলিশ ইউনিয়ন জানিয়েছে, বৈঠক হলেও তা থেকে কোনো নতুন নির্দেশনা আসেনি।
‘পুল ফ্যাক্টর’
ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) তাদের সীমান্ত পাহারায় সহায়তার জন্য উত্তর আফ্রিকার কয়েকটি দেশের একটি হলো মরক্কো। ২০২৩ সালে দেশটি ১৫২ মিলিয়ন ইউরো (১৭৬ মিলিয়ন ডলার) পেয়েছিল। মরক্কো জানিয়েছে, তারা উত্তরাঞ্চলের সীমান্ত নিয়ন্ত্রণে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ইউরো ব্যয় করে। বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গণ অতিক্রমের আহ্বান শনাক্ত হলে সীমান্তে পরীক্ষা-নিরীক্ষা জোরদার করে দেশটি।
স্প্যানিশ ও মরক্কোর সীমান্তকর্মীরা জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময় থেকে অতিক্রমের চেষ্টা বাড়ার কথা জানিয়েছিলেন। তবে মরক্কোতে আরও কঠোর ব্যবস্থা—যেমন বাস ও ট্রেন স্টেশনে তল্লাশি—গণ অতিক্রমের মাত্র এক-দুই দিন আগে শুরু হয়। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন, এনজিওগুলোর সাক্ষ্য এবং রয়টার্সের এক প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্য অনুযায়ী, ২৯ জুলাই আগমনের সংখ্যা হাজার হাজারে পৌঁছালেই মরক্কো উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বাড়তি বাহিনী পাঠায়।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের উত্তর আফ্রিকা প্রকল্প পরিচালক রিকার্দো ফাবিয়ানি বলেন, ‘তারা আগে থেকে কিছুই করেনি। এটি আমার কাছে একটি নীতিগত ব্যর্থতা মনে হচ্ছে।’
মরক্কোর একজন জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, আদালতের রায়ের পর স্প্যানিশ সমকক্ষদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে এতে কোনো সমস্যা তৈরি হবে কি না। স্পেন কী জবাব দিয়েছিল তা তিনি জানাননি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তার ভাষ্য, এই পরিণতি মোকাবিলার দায়িত্ব ছিল স্পেনের। ৩ আগস্ট সাংবাদিকদের ওই জ্যেষ্ঠ মরক্কোর সরকারি কর্মকর্তা বলেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সংখ্যা বাড়িয়ে কিছুই অর্জন হতো না। কারণ ‘পুল ফ্যাক্টর’ এতটাই শক্তিশালী ছিল।
অভিবাসী ঠেকাতে ইইউকে আরও কিছু করার আহ্বান
সীমান্ত ঢল এবং তার আগের সপ্তাহগুলোতে মাদ্রিদ ও রাবাতের অবস্থান নিজেদের সীমান্ত পাহারায় ইউরোপের অন্যান্য দেশের ওপর নির্ভরতার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারপরও স্পেন ও মরক্কো তাদের সহযোগিতার প্রশংসা করেছে এবং ইইউ জানিয়েছে যে তারা আরও আর্থিক সহায়তা দিতে পারে। ইউরোপীয় কমিশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, স্পেন ও মরক্কো উভয়ের সঙ্গে সীমান্ত জোরদারে কাজ চালিয়ে যাবে তারা। এ ছাড়া গত মাসে সীমান্তে ঘটে যাওয়া ঘটনা দুটি তদন্ত করছে দুই দেশ।
তবে মরক্কোর কর্মকর্তারা এটিও জোর দিয়ে বলেছেন যে ইউরোপকে অভিবাসীদের প্রথমেই নিরুৎসাহিত করার ক্ষেত্রে আরও ভালো করতে হবে।
স্পেন সরকার অভিবাসন প্রশ্নে অনেক প্রতিবেশীর চেয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়েছে। তারা আরও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নেয়ার আহ্বান জানিয়ে অনথিভুক্ত অভিবাসীদের নিবন্ধন করছে। এতে তারা কাজের অনুমতি পাবে এবং দ্রুত বেড়ে ওঠা অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারবে।
মরক্কোর বিচারমন্ত্রী আবদেললাতিফ ওয়াহবি এই সপ্তাহে স্পেনের ‘ইএফই’ বার্তা সংস্থাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘স্পেন যদি ঘোষণা করে যে তারা সব অভিবাসীকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক, তবে আমরা কেন মানুষকে সীমান্ত-বেড়া টপকাতে বা সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করছি? চলুন, সীমান্ত খুলে দিই। আপনারা যদি তাদের গ্রহণ করতে যান, তবে আমরা কেন তাদের থামাচ্ছি?’





