বিমানের ভেতরে বসে জানালার পর্দা নামানো, মাথার ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন—প্রেসিডেন্ট কি সত্যিই এই বিমানে আছেন, নাকি ইরানের হত্যাচেষ্টার ছক এড়াতে অন্য কোথাও সরিয়ে নেয়া হয়েছে তাকে? গত জুলাইয়ে আঙ্কারা থেকে ফেরার সময় ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানের’ ভেতরে থাকা মার্কিন সাংবাদিকদের কেটেছে এমনই এক রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে আসলে ওই বিমানে ছিলেনই না, বরং একটি খাবার সরবরাহকারী ট্রাকে করে অন্য বিমানে সরিয়ে নেয়া হয়েছিল তাকে—সেই নাটকীয় সত্য জানতে সাংবাদিকদের অপেক্ষা করতে হয়েছে পুরো এক মাস।
সেদিন ট্রাম্পের সঙ্গে থাকা প্রেস পুলের একজন সদস্য পরে সেই দিনের ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন। তার বর্ণনায় উঠে এসেছে নাটকীয়তায় ভরা সেই যাত্রার নানা খুঁটিনাটি।
অস্বাভাবিক ফ্লাইটে সূচি বদল
আঙ্কারায় ন্যাটো নেতৃবৃন্দের সম্মেলনের শেষ মুহূর্তে ট্রাম্প ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ ঘোষণা দেন যে কাতারের কাছ থেকে উপহার পাওয়া নতুন প্রেসিডেন্সিয়াল বিমানটিতে চড়ে তিনি আর ওয়াশিংটনে ফিরবেন না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের মিল্ডেনহল বিমানঘাঁটির সেনা সদস্যদের ঘুরে দেখানোর জন্য বিমানটিকে তিনি আগেই সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছেন। কীভাবে ফিরবেন তা স্পষ্ট না করেই তিনি জানান, পুরনো একটি ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানে’ চড়ে তিনি মিল্ডেনহলে যাবেন।
এই সূচি পরিবর্তনে সঙ্গে থাকা সাংবাদিকরা হতভম্ব হয়ে যান এবং ট্রাম্পের ব্যাখ্যাটিও তাদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়নি। তারা নিজেদের মধ্যে জিজ্ঞেস করতে শুরু করেন—ইরান কি সত্যিই প্রেসিডেন্টকে হত্যার সুনির্দিষ্ট কোনো ছক কষেছে? শুরুতে সাংবাদিকদের যাত্রাপথও ছিল রহস্যাবৃত। যদিও তারা ধরে নিয়েছিলেন, যুক্তরাজ্যে যাত্রাবিরতির পর পূর্ব-পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা ওয়াশিংটনেই ফিরছেন।
নিরাপত্তার আশঙ্কা সংক্রান্ত এই প্রাথমিক অনুমান যদি সত্যি হয়, তবে কাতারের দেয়া বিমানটি যথেষ্ট নিরাপদ নাও হতে পারে। কারণ এতে কিছু নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি রয়েছে বলে জানা যায়। এটিই হতে পারে হোয়াইট হাউসের বিমান বদলের কারণ, যার মানে দাঁড়ায় সাংবাদিকরা সাধারণের তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক এক উড়ানের সম্মুখীন হতে যাচ্ছিলেন।
সম্মেলনের শেষ দিন ৮ জুলাই ট্রাম্প নিজেই অজান্তে হুমকির বিষয়ে জল্পনা উসকে দিয়েছিলেন। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা থেকে শুরু করে ইউক্রেনের নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কির সঙ্গে বৈঠককালে বিভিন্ন সময়ে তিনি তাকে হত্যার জন্য ইরানের দীর্ঘদিনের চেষ্টার কথা সাংবাদিকদের সামনে উল্লেখ করেছিলেন। তুরস্ক ছাড়ার আগে দেয়া এক সংবাদ সম্মেলনে বিমান বদলের প্রসঙ্গটি বেশির ভাগই এড়িয়ে যান ট্রাম্প। এতে অস্বাভাবিক কিছু ঘটার আশঙ্কা আরও তীব্র হয়ে ওঠে।
জানালার পর্দা নামাতে বললেন হোয়াইট হাউসের কর্মীরা
সাংবাদিকরা যে বিমানটিকে প্রেসিডেন্টের বিমান বলে ধারণা করেছিলেন সেটিতে উঠলে হোয়াইট হাউসের কর্মীরা তাদের জানালার পর্দা নামিয়ে রাখতে বলেন। ব্যাখ্যা চাইলে তাদের জানানো হয়, এটি সিক্রেট সার্ভিসের অনুরোধ। অতীতে প্রেসিডেন্সিয়াল বিমানে ভ্রমণ করার অভিজ্ঞতা থেকে সাংবাদিকরা জানতেন, এই ধরনের নির্দেশনা অস্বাভাবিক। এটি কি কোনো গোপন প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি আড়াল করার চেষ্টা এই প্রশ্নও তখন তাদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছিল।
কয়েক সপ্তাহ পরই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। নিরাপত্তার আশঙ্কার কারণে ট্রাম্পকে বিমান থেকে একটি খাবার সরবরাহকারী ট্রাকে করে সরিয়ে অন্য একটি সরকারি বিমানে ওঠানোর গোপন অভিযান আড়াল করতেই আসলে সাংবাদিকদের এই নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।
‘এয়ার ফোর্স ওয়ানের’ ভেতরে তথ্য জোগাড় করা সত্যিকার অর্থেই কঠিন। নিরাপত্তার কারণে সাংবাদিকদের ওয়াই-ফাই ব্যবহারের সুযোগ নেই। এ ছাড়া হোয়াইট হাউসের কর্মীদের মধ্যে সাধারণত সাংবাদিকরা যোগাযোগ রাখতে পারেন কেবল ‘র্যাংলার’ পরিচিত একজন লজিস্টিক স্টাফের সঙ্গে, যার কাছে স্পর্শকাতর তথ্য থাকে না বা তা দেয়ার অনুমতিও থাকে না।
ইংল্যান্ডে অবতরণের পর নাটকীয় মোড়
আঙ্কারা থেকে মিল্ডেনহল পর্যন্ত ফ্লাইটটি নির্ঝঞ্ঝাটই ছিল, তবে সাংবাদিকদের পক্ষে স্বস্তির সঙ্গে ভ্রমণ করা কঠিন ছিল। তারা ভুলবশত মনে করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট যেকোনো মুহূর্তে হাজির হতে পারেন। তাদের ফ্লাইটের চারপাশের পরিস্থিতিও রহস্য হয়েই থেকে গিয়েছিল। যদিও ট্রাম্প ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানে’ সাংবাদিকদের সঙ্গে প্রায়ই কথা বলেন না, তাই তার অনুপস্থিতিতে বিশেষ কেউ অবাক হননি। তবে সন্ধ্যায় ইংল্যান্ডে অবতরণের পর সফরটি আরেকটি অস্বাভাবিক মোড় নেয়।
বিমান থেকে নামার সময় সাংবাদিকরা দেখেন, ট্রাম্প বিমানের অন্য একটি অংশ থেকে নামছেন। পরে বোঝা যায়, এটিও পুরো প্রতারণামূলক অভিযানের একটি বিস্তৃত অংশ ছিল। হোয়াইট হাউসের কর্মীরা এরপর সাংবাদিকদের হেঁটে ট্রাম্পকে অনুসরণ করতে বলেন। তিনি কাতারের দেয়া ‘এয়ার ফোর্স ওয়ানের’ দিকে হেঁটে যাচ্ছিলেন, যেটি সাংবাদিকরা যে বিমান থেকে নেমেছিলেন তার কয়েক শ গজ সামনে রাখা ছিল। সিক্রেট সার্ভিসের এজেন্টরা প্রেসিডেন্টকে ঘিরে ছিলেন এবং তাদের ডানপাশে একটি কালো সরকারি এসইউভি ধীরে ধীরে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। প্রেস পুলের ওই সদস্য জানান, হোয়াইট হাউস কভার করার তার অভিজ্ঞতায় এই কৌশলটি সম্পূর্ণ নতুন এবং লোক-দেখানো ও চলচ্চিত্রসুলভ মনে হয়েছে।
নতুন বিমানে ওঠার পর যাত্রা শুরু হলে হোয়াইট হাউসের এক সহকারী ট্রাম্পের একটি ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ পোস্টের প্রিন্টআউট সাংবাদিকদের হাতে ধরিয়ে দেন। ওই পোস্টে কাতারের দেয়া বিমানের সামনে জড়ো হওয়া সেনা সদস্য ও তাদের পরিবারের একটি অন্ধকার ছবিও ছিল। পোস্টে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘পুরো’ ঘাঁটিই বিমানটি দেখতে চেয়েছিল এবং মিল্ডেনহলে থামার জন্য আঙ্কারা-ওয়াশিংটন ফ্লাইটের সাধারণ পথ থেকে ‘কার্যত কোনো বিচ্যুতি’ ঘটানোর প্রয়োজন হয়নি।
কিছুক্ষণ পর প্রেসিডেন্ট প্রেস কেবিনে আসেন। কাতারের বিমানে ইংল্যান্ডে না আসার আসল কারণ নিয়ে সাংবাদিকরা তাকে একের পর এক প্রশ্ন করেন। ট্রাম্প আসলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মিল্ডেনহলে আসেননি এবং এতে তৃতীয় আরেকটি বিমান জড়িত ছিল এই বিষয়টি স্পষ্ট হতে পরে আরও এক মাস লেগে যায়।
ফ্লাইটের সময় নিরাপত্তার আশঙ্কার কথা অস্বীকার করেন প্রেসিডেন্ট। তবে জানালার পর্দা কেন নামাতে হয়েছিল, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি ইরানের পক্ষ থেকে আসা নিরন্তর হুমকির কথা স্বীকার করেন। ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘তবে আমি যদি মরি, আপনারাও মরবেন। তাই না? সম্ভবত একদিন আপনারা পেশা বদলাতে চাইবেন।’
—বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে অবলম্বনে





