বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইসরাইল ও ইরানের চাপে পড়া অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে একটি বৃহত্তর জোটের সূচনা হতে পারে এই চুক্তি। এই দুই দেশ সম্পর্কেই সন্দিহান বাকি রাষ্ট্রগুলো। তবে চুক্তিতে অংশ নেয়া তিন দেশ শক্তি ও ঐক্যের বার্তা দিলেও এটিকে সরাসরি কারও বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে তুলে ধরতে সতর্ক রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও খারাপ না করার বিষয়েও তারা সচেতন। ফলে জোটের সদস্যরা কতটা পরস্পরের প্রতিরক্ষায় এগিয়ে আসবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
কিলোয়েন গ্রুপের চেয়ারম্যান হার্লান উলম্যান আল-জাজিরাকে বলেন, ‘মক্কার ঘোষণাপত্রটি আমরা এখনো দেখিনি। আমাদের ধারণা, এতে বলা হয়েছে—একজনের ওপর হামলা সবার ওপর হামলা হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত। এখানে ‘উচিত’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মানে ‘অবশ্যই’ নয়।’ এই সতর্কতার পেছনে বাস্তব কারণও রয়েছে। পাকিস্তান গত ফেব্রুয়ারি থেকেই আফগানিস্তানের সঙ্গে সীমান্ত সংঘাতে জড়িত। এ ছাড়া গত মে মাসে পারমাণবিক শক্তিধর ভারতের সঙ্গেও কয়েক দিন গোলাগুলি হয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সৌদি আরবও বারবার ইরান ও তাদের মিত্রদের হামলার শিকার হয়েছে। অন্যদিকে তুরস্ক দীর্ঘদিন ধরে কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করছে; পাশাপাশি ইসরাইলের সঙ্গেও তাদের উত্তেজনা বেড়েছে।
উলম্যান বলেন, ‘ধরুন, ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরবে হামলা চালাল—এতে কি তুরস্ক জড়িয়ে পড়বে? পাকিস্তান কি এগিয়ে আসবে? এটি এখনো দেখার বিষয়।’
আঞ্চলিক সমীকরণ বদলাচ্ছে
গাজায় ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলা এবং পরবর্তী ইসরাইলি গণহত্যার পর মধ্যপ্রাচ্য বড় ধরনের অস্থিরতার মুখে পড়েছে। ইরান-ইসরাইলের কয়েক দশকের বৈরিতা রূপ নিয়েছে আঞ্চলিক যুদ্ধে। এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে পুরনো মতবিরোধ ভুলে অনেক দেশই এখন বাস্তববাদী পথ বেছে নিচ্ছে। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ তুরস্ক ও সৌদি আরব। ২০১৮ সালে ইস্তাম্বুলে সৌদি কনস্যুলেটের ভেতরে সাংবাদিক জামাল খাশোগি হত্যাকাণ্ডের পর দুই দেশের সম্পর্কে বড় ফাটল ধরেছিল। কিন্তু ২০২২ সাল থেকে সেই ফাটল মেরামত হতে থাকে; রিয়াদ আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর কৌশল নেয় এবং আঙ্কারা অর্থনীতি চাঙ্গা করার পথে হাঁটে।
প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
আল-জাজিরার প্রতিবেদক ওসামা বিন জাভেদ জানান, চুক্তির প্রতিটি পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন শক্তি নিয়ে এই জোটে এসেছে। তার ভাষায়, ‘পাকিস্তান নিয়ে এসেছে যুদ্ধকঠিন সামরিক বাহিনী, বিপুল সমরাস্ত্র ও কোনো মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের একমাত্র পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার। তুরস্ক ন্যাটোর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে বিশ্বমানের ড্রোন প্রযুক্তি ও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা উৎপাদন সক্ষমতা যোগ করেছে। আর সৌদি আরব দিচ্ছে এই সব কিছু চালিয়ে নেয়ার অর্থবল।’
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর ক্রমবর্ধমান অনাস্থাও এই জোট গঠনে বড় ভূমিকা রেখেছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের অস্থির পররাষ্ট্রনীতির কারণে অনেক দেশ এখন বিকল্প খুঁজছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্র সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করায় অন্য মিত্রদের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে। উলম্যান বলেন, ‘ট্রাম্প প্রশাসন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, মিত্রদের নিজেদের নিরাপত্তা নিজেদেরই দেখতে হবে। আমার কাছে এটি স্পষ্ট যে, আমাদের মিত্ররা এখন বিকল্প খুঁজছে।’
বিন জাভেদের ভাষায়, ‘এই তিন দেশের কাছেই আঞ্চলিক নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় হুমকি হল ইসরাইল। বিশেষ করে ওয়াশিংটনের স্বার্থে ইরানের হামলার পর সৌদি আরবের জন্য তেহরানও কাছাকাছি হুমকি হিসেবে অবস্থান করছে।’ ২০২৩ সালের পর ইসরাইল দেখিয়েছে, তারা আলোচনার চেয়ে সামরিক শক্তি প্রয়োগেই বেশি আগ্রহী। ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনইয়ামিন নেতানিয়াহু নিজেও ‘সুন্নি অক্ষ’ গঠনের বিপদ নিয়ে কথা বলতে শুরু করেছেন, যদিও এটি স্পষ্ট করে সংজ্ঞায়িত করেননি। বিশ্লেষকরা মনে করেন, তার এই মন্তব্যই সুন্নি-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোকে এক হতে বাধ্য করছে।
জোটে কি নতুন সদস্য আসবে?
মিসর, কাতার, সিরিয়া বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো (ইউএই) দেশগুলো ভবিষ্যতে এই জোটে যোগ দেবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। মধ্যপ্রাচ্যে সুন্নি সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের বিভাজনের কারণেই ইসরাইল ও ইরানের হুমকি মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে বলে অনেকের মত। তবে অতীতের মতপার্থক্য ও ভিন্ন স্বার্থের কারণে এই জোটের সম্প্রসারণ সহজ নয়।
সিরিয়া ১৩ বছরের যুদ্ধের পর এখন পুনর্গঠনে ব্যস্ত এবং ইসরাইলের সীমান্তে অবস্থানের কারণে তারা এমন কোনো জোটে যোগ দিতে দ্বিধায় থাকবে। মিসর অর্থনীতি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতার দিকে মনোযোগ দিচ্ছে; এর আগে তারা সৌদি নেতৃত্বাধীন সামুদ্রিক জোটে যোগ দিতেও রাজি হয়নি। অন্যদিকে ইউএই ইসরাইলের সঙ্গে ‘আব্রাহাম চুক্তি’র মাধ্যমে সম্পর্ক স্বাভাবিক করেছে, যা মক্কা জোটের সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দাঁড়াতে পারে।
এই জোটের প্রকৃত পরীক্ষা হবে বাস্তব পরিস্থিতিতে। ইসরাইল ও ইরান দেখিয়েছে, তারা যুদ্ধে যেতে ও তার পরিণতি ভোগ করতে প্রস্তুত। কিন্তু সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান কি একে অপরের জন্য একই ঝুঁকি নিতে রাজি? ভবিষ্যতে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যা তাদের এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করবে। সেই সিদ্ধান্তই পরিষ্কার করবে—মধ্যপ্রাচ্যে সত্যিই তৃতীয় কোনো আঞ্চলিক অক্ষ গড়ে উঠছে কি না।





