চীনের সামরিক গবেষণায় ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগ

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বার্ষিকী কুচকাওয়াজে চীনের ওয়াইজে-১৮সি ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বার্ষিকী কুচকাওয়াজে চীনের ওয়াইজে-১৮সি ক্ষেপণাস্ত্র প্রদর্শন | ছবি: সংগৃহীত
0

চীনের সামরিক গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রোপিকের এআই মডেলগুলো থেকে পাওয়া আউটপুট বা ফলাফল ব্যবহার করে নিজেদের সামরিক এআই ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাচ্ছেন। চীনের ৮০টিরও বেশি একাডেমিক গবেষণাপত্র ও পেটেন্ট পর্যালোচনা করে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এই তথ্য জানিয়েছে।

এর আগে অপ্রকাশিত এসব তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, উন্নত চিপ ও কৌশলগত প্রযুক্তির ওপর চীনের প্রবেশাধিকার সীমিত করতে ওয়াশিংটনের নানা পদক্ষেপ সত্ত্বেও, দেশটির সামরিক ও নিরাপত্তা-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলোকে নিজেদের বিশেষায়িত ব্যবস্থা তৈরির শর্টকাট হিসেবে ব্যবহার করছে।

গবেষণাপত্রগুলোতে ‘মডেল ডিস্টিলেশন’ নামের একটি কৌশলের বহুল ব্যবহার দেখা গেছে। এই পদ্ধতিতে শক্তিশালী কোনো এআই ব্যবস্থার আউটপুট ব্যবহার করে ছোট আকারের বিশেষায়িত মডেল তৈরি করা হয়, যা বিপুল কম্পিউটিং শক্তির প্রয়োজন ছাড়াই স্থানীয়ভাবে চালানো যায়। ওয়াশিংটনভিত্তিক জেমসটাউন ফাউন্ডেশনের তৈরি করা গবেষণাপত্র রয়টার্সকে দেয়া হয়েছে। সেগুলো পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) এবং অন্যান্য সামরিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা ব্যাপকভাবে ডিস্টিলেশন ব্যবহার করছেন।

গবেষণাপত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে, চীনের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই মডেলগুলোকে একদিকে যেমন কারিগরি জ্ঞানের উৎস হিসেবে দেখছে, তেমনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে পার্থক্য কমানোর মাধ্যম হিসেবেও কাজে লাগাচ্ছে। বিতর্কের মূল বিষয়টি ডিস্টিলেশন কৌশল নিয়ে নয়; মূলত অনুমতি ছাড়া তথ্য বের করে নেয়া নিয়ে।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এআই ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনার ঠিক আগে বিষয়টি বড় ধরনের বিতর্ক তৈরি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তাদের অভিযোগ, কয়েকটি চীনা প্রতিষ্ঠান মার্কিন এআই মডেলগুলোর সক্ষমতা বের করে নিতে ডিস্টিলেশন কৌশল ব্যবহার করছে, যা রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে এবং মেধাস্বত্ব লঙ্ঘনের শামিল। চীন এই অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ওয়াশিংটন এআই খাতে ‘আধিপত্যবাদ’ চর্চা করছে; মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোও একই ধরনের কাজ করছে।

চীনা এআই উদ্যোক্তারাও নিজেদের অগ্রগতি বিদেশি মডেলের ওপর নির্ভরশীল—এমন দাবি নাকচ করেছেন। এআই স্টার্টআপ মুনশট গত সপ্তাহে ট্রাম্প প্রশাসনের অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের কিমি কে৩ মডেলটি ডিস্টিলেশন ব্যবহার করে বানানো হয়নি, বরং তা তাদের নিজস্ব প্রযুক্তির ফসল।

৬০টিরও বেশি গবেষণাপত্র বিশ্লেষণকারী জেমসটাউনের গবেষক সানি চিয়াং বলেন, চীনা সামরিক বিজ্ঞানীরা পশ্চিমা মডেলগুলোর যুক্তির ধাপগুলো ধরে ধরে সংগ্রহ করছেন এবং সেগুলোকে নজরদারি, সাইবার যুদ্ধ ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, ‘একটি মডেলকে সঠিক উত্তর শেখানো এক জিনিস, কিন্তু উত্তরের পেছনের যুক্তি শেখানো অনেক কঠিন কাজ। এসব গবেষণাপত্র থেকে বোঝা যায়, চীনের সামরিক-সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা পশ্চিমা মডেলগুলোর সেই ব্যয়বহুল যুক্তি-প্রক্রিয়াকে ছোট মডেলে স্থানান্তর করার চেষ্টা করছেন।’

গত বছর প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বেইজিংয়ের পিএলএ ইউনিট ৯৬৯৪১-এর গবেষকেরা বলেছেন, তারা স্পর্শকাতর সামরিক সোর্স কোড প্রক্রিয়াকরণে ওপেনআই-এর জিপিটি-৩.৫ ব্যবহার করেছেন। শ্রেণিবদ্ধ তথ্যের জন্য তৃতীয় পক্ষের মডেল উপযোগী নয়। তাই তারা জিপিটি-৩.৫ ব্যবহার করে সফটওয়্যার কোডের সারমর্ম তৈরি করেছেন এবং সেই সারমর্ম দিয়ে চীনা সামরিক নেটওয়ার্কের ভেতরে চলার উপযোগী একটি স্থানীয় মডেলকে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন।

এই বিষয়ে হোয়াইট হাউস, পেন্টাগন, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পিএলএ ও ওপেনএআইয়ের কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

চীনের নর্থ ইউনিভার্সিটির গবেষকেরা সোশ্যাল মিডিয়া নজরদারি ও কনটেন্ট মডারেশনের জন্য অ্যানথ্রোপিকের ক্লদ ৩ হাইকু ব্যবহার করে প্রশিক্ষণ তথ্য তৈরি করেছেন। অ্যানথ্রোপিক জানিয়েছে, চীন বা বেইজিং-নিয়ন্ত্রিত কোনো প্রতিষ্ঠানকে তারা ক্লদ ব্যবহারের বাণিজ্যিক অনুমতি দেয়নি এবং নীতি লঙ্ঘন ঠেকাতে নজরদারি ব্যবস্থা চালু রেখেছে।

এ ছাড়া পিএলএর ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব ডিফেন্স টেকনোলজির ২০২৪ সালের একটি গবেষণাপত্রে দেখা গেছে, চালকবিহীন আকাশযানে (ইউএভি) ব্যবহারের জন্য একটি ছবি প্রক্রিয়াকরণ মডেলকে ছোট করতে ডিস্টিলেশন ব্যবহার করা হয়েছে। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকলেও ড্রোনগুলো সরাসরি ভিডিও বিশ্লেষণ করে দিকনির্দেশনা ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হবে। চীনের একাডেমি অব মিলিটারি সায়েন্সেসের গবেষকেরাও ড্রোন, জাহাজ ও চালকবিহীন সাবমেরিন নিয়ে সিমুলেশনভিত্তিক সামুদ্রিক অভিযানে লক্ষ্যবস্তু শনাক্তকরণে এই কৌশল কাজে লাগিয়েছেন।

উন্নত চিপের ওপর ওয়াশিংটনের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণের কারণে কম্পিউটিং সক্ষমতায় ঘাটতির মুখে চীন ডিস্টিলেশন কৌশলকে সাদরে গ্রহণ করেছে। কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সরকার ‘মডেল লাইটওয়েটিং’ ও এজ কম্পিউটিং প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ ও ভর্তুকি দিচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ডিস্টিলেশনের সীমাবদ্ধতাও আছে। ডিস্টিলড মডেলগুলো তাদের ‘শিক্ষক’ মডেলের সব সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না।

এআই ডেটা কোম্পানি সাপিয়েনের সহপ্রতিষ্ঠাতা ট্রেভর কোভারকো বলেন, ‘ডিস্টিলড মডেলগুলো তাদের মূল মডেলের তুলনায় দুর্বল। একে সঠিকভাবে বুঝতে হলে বলতে হবে, এটি নির্দিষ্ট কিছু সক্ষমতা কম খরচে স্থানীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার একটি উপায়; কিন্তু কোনোভাবেই অত্যাধুনিক এআই থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পথ নয়।’

এএম