বাব-এল-মান্দেব বন্ধের হুমকি হুতিদের; শঙ্কায় বিশ্ব বাণিজ্য ও জ্বালানি

স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যাচ্ছে বাব আল-মান্দেব প্রণালি | ছবি: রয়টার্স
0

ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি নতুন ফ্রন্ট খুলে দিয়ে সৌদি আরবের ওপর নৌ অবরোধ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতিরা। গতকাল (সোমবার, ২০ জুলাই) এই ঘোষণা দেয় তারা, যা উপসাগরের বাইরেও বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যের জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মার্কিন সেনাদের জন্য এই যুদ্ধের অন্যতম প্রাণঘাতী সময়ের মধ্যেই এই উত্তেজনা বাড়ল। গত শুক্রবার জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানি হামলায় নিহত দুই সেনার পরিচয় গতকাল (সোমবার, ২০ জুলাই প্রকাশ করেছে পেন্টাগন। এ ছাড়া নিখোঁজ তৃতীয় সেনার হতে পারে এমন অজ্ঞাত মরদেহ পাওয়ার কথাও জানিয়েছে তারা। এদিকে, উত্তর ইরাকে ইরানি ‘ওয়ান ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন’-এর অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণে চতুর্থ আরেকজন মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন।

হুতিদের ঘোষণার পর ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা এর কঠোর জবাব দেবে। হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাব-এল-মান্দেব প্রণালি এখন সৌদি তেল রপ্তানির প্রধান পথ। এই প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী নিজেদের জাহাজগুলোর সুরক্ষায় ইতিমধ্যেই ব্যবস্থা নিতে শুরু করেছে জোট।

তবে ওয়াশিংটন ও তেহরান কূটনৈতিক পথে ফিরতে পারে এমন ইঙ্গিতের মধ্যেই হুতিরা এই ঘোষণা দিল। গত মাসে সই হওয়া নাজুক অন্তর্বর্তী চুক্তিটি ভেঙে পড়ার পর হামলার এই চক্র ক্রমেই ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানকে কিছু ‘প্রস্তাব’ দিয়েছেন। যদিও এর বিস্তারিত জানানো হয়নি।

হুতিদের ঘোষণার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম কিছুটা বাড়লেও কূটনৈতিক অগ্রগতির আশায় তা আবার কিছুটা কমে যায়। লোহিত সাগরে পণ্য পরিবহনের বিমা খরচ বেড়ে গেছে। ইরান দীর্ঘদিন ধরেই হুতিদের ওপর চাপ দিচ্ছিল, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোয় হামলা চালিয়ে গেলে তারা যেন লোহিত সাগরের প্রবেশদ্বার বাব-এল-মান্দেব বন্ধ করে দেয়।

এই প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহ ৭ শতাংশ কমে যাবে, কারণ সৌদি আরবের বেশির ভাগ তেল রপ্তানি এই অঞ্চল থেকে বের হতে পারবে না। উপসাগরে যুদ্ধের কারণে এমনিতেই বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহ ১০ শতাংশ কমেছে। হুতি বাহিনী তাদের বিবৃতিতে বলেছে, ইয়েমেনিদের ওপর সৌদিদের চাপিয়ে দেয়া ‘অন্যায় ও নিপীড়নমূলক অবরোধের’ জবাবে ‘চোখের বদলে চোখ’ নীতিতে তারা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।

যুদ্ধবিরতি ফেরাতে কূটনৈতিক তৎপরতা
ইরানের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা গতকাল (সোমবার, ২০ জুলাই) রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অন্তর্বর্তী চুক্তিটি টিকিয়ে রাখতে মধ্যস্থতাকারীরা তেহরানকে ১০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছেন। পাকিস্তান সরকারের দুটি সূত্র জানিয়েছে, ইরানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এস্কান্দার মোমেনি পাকিস্তানকে পুনরায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালনের অনুরোধ জানিয়েছেন। এরপর তিনি ইসলামাবাদে পৌঁছেছেন।

এই কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেও ইরানের বিভিন্ন শহরে মার্কিন হামলা এবং সৌদি ও উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ইরানি হামলা চলছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছেন, ‘ইরান যতবার মার্কিন সেনাকে হত্যা করবে, ততবারই তারা এর জন্য বহুগুণ মূল্য দেবে!’

যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গ্যাসোলিনের দাম বাড়ায় ট্রাম্প দেশে ব্যাপক রাজনৈতিক চাপে রয়েছেন। এই যুদ্ধে প্রধানত ইরান ও লেবাননে হাজার হাজার মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। লেবাননের একটি অংশ ইতিমধ্যেই ইসরাইলি বাহিনীর দখলে চলে গেছে। ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে হিজবুল্লাহ ইসরাইলে হামলা চালানোর পর সেখানে ইসরাইলি অভিযান শুরু হয়। আজ (মঙ্গলবার, ২১ জুলাই) লেবাননের প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের হোয়াইট হাউসে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। বৈঠকে হিজবুল্লাহর নিরস্ত্রীকরণ ও ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের একটি পরিকল্পনা তুলে ধরবেন তিনি।

ট্যাংকারে বিস্ফোরণের দাবি ইরানের
ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি) দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালির ‘অনিরাপদ’ পথ ব্যবহার করে যাওয়ার সময় দুটি তেলবাহী ট্যাংকারে বিস্ফোরণ ঘটেছে। এর আগে রোববারও একই এলাকায় দুটি জাহাজ ‘দুর্ঘটনায়’ পড়েছিল বলে জানিয়েছিল তারা। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এজেন্সি জানিয়েছে, ওমান উপকূলে হরমুজ প্রণালির কাছে অজ্ঞাত প্রজেক্টাইলের আঘাতে একটি জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইরানের তাবরিজ, চাবাহার, কোনারাক, বন্দর মাহশাহর ও বন্দর ইমাম খোমেনিতে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনার বরাতে জানা গেছে, তাবরিজের দক্ষিণ-পশ্চিমে একজন নিহত ও বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আইআরজিসি জানিয়েছে, তারা জর্ডানের আকাবা বিমানবন্দরে থাকা মার্কিন বিমান, কুয়েতের আল-আদিরি ক্যাম্প ও আলি আল সালেম বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়ায় সামরিক স্থাপনায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। গতকাল (সোমবার, ২০ জুলাই) সারা দিন বাহরাইনে সাইরেন বেজেছে এবং কুয়েতের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও আজ (মঙ্গলবার, ২১ জুলাই) ভোরে ইরানি ড্রোন প্রতিহত করেছে।

এএম