ইরানে মার্কিন হামলা: পানি সংকটে ১০ হাজার মানুষ, কুয়েতের পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রে আগুন

রাতে বিমানবাহী জাহাজের ডেকে যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে
রাতে বিমানবাহী জাহাজের ডেকে যুদ্ধবিমান উড্ডয়নের প্রস্তুতি নিচ্ছে | ছবি: সংগৃহীত
0

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ক্রমবর্ধমান সংঘাত বেসামরিক অবকাঠামোয় ক্রমেই বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ইরানি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাতভর মার্কিন হামলায় প্রায় ১০ হাজার মানুষকে পানি সরবরাহকারী একটি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে গেছে। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

হরমোজগান পানি ও পয়ঃনিষ্কাশন কোম্পানির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হামজেহ পুর জানিয়েছেন, জাস্কের বুনজি গ্রামে বিশুদ্ধকরণ পাম্প ও বৈদ্যুতিক অবকাঠামোয় মার্কিন হামলা হয়েছে। এতে ২০টি গ্রামের পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিমকে পুর বলেন, ‘২০টি গ্রামের প্রায় ১০ হাজার মানুষের কাছে পানীয় জলের সরবরাহ পুরোপুরি ব্যাহত হয়েছে।’

পুর এই হামলাকে ‘ধারাবাহিক অপরাধ ও সন্ত্রাসী হামলা’ বলে অভিহিত করেন। তিনি আরও জানান, বুনজি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রের সমুদ্রের পানি পাম্পিং স্টেশন এবং একটি বৈদ্যুতিক ট্রান্সফরমার ‘সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস’ হয়ে গেছে। তিনি যোগ করেন, ‘এসব গ্রামের মানুষ তীব্র পানি সংকটের মুখে পড়েছেন।’

এই ক্ষয়ক্ষতির খবর এসেছে যখন যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, তারা ইরানের বিরুদ্ধে টানা সপ্তম দফা হামলা সম্পন্ন করেছে। সেন্টকম জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হামলায় তারা ইরানের নজরদারি স্থাপনা, সামরিক সরবরাহ অবকাঠামো, ভূগর্ভস্থ অস্ত্রাগার এবং সামুদ্রিক সম্পদকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

কমান্ডটি জানায়, এই অভিযানে যুদ্ধবিমান, ড্রোন, রণতরিসহ অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম অংশ নেয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে এখনো ৫০ হাজারের বেশি মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। উপসাগরজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ায় কুয়েতের বিদ্যুৎ, পানি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইরানের সর্বশেষ হামলার পর একটি বিদ্যুৎ উৎপাদন ও পানি বিশুদ্ধকরণ কেন্দ্রের একটি অংশে আগুন লেগেছে।

মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ‘এই ঘটনায় সতর্কতামূলক পরিচালনগত ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। এর মধ্যে ছিল কেন্দ্র ও এর কর্মীদের সুরক্ষা এবং বৈদ্যুতিক গ্রিডের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি জেনারেটিং ইউনিট বিচ্ছিন্ন করা।’ মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও যোগ করা হয়েছে, ‘বিদ্যুৎ ও পানির সেবা বজায় রাখতে জরুরি পরিকল্পনা সক্রিয় করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত দলগুলো পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে যাচ্ছে।’

সাম্প্রতিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার সময় নিজেদের আকাশসীমা বন্ধ করে কুয়েত তাদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে এবং বেশির ভাগ বাণিজ্যিক ফ্লাইটের সময়সূচি পরিবর্তন করেছে। এদিকে মার্কিন সামরিক বাহিনীর আশ্রয়দাতা দেশগুলোর প্রতি ‘যথাযথ জবাবের’ জন্য প্রস্তুত থাকতে সতর্ক করেছে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোর (আইআরজিসি)।

এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, এসব দেশের উচিত ‘নাগরিকদের রক্ষা এবং সম্ভাব্য সামরিক লক্ষ্যবস্তু থেকে দূরে সরিয়ে নিতে বেসামরিক প্রতিরক্ষা ইউনিট সক্রিয় করা।’ ইরানের বিরুদ্ধে ‘আগ্রাসনের উৎক্ষেপণ কেন্দ্র’ হিসেবে নিজেদের ভূখণ্ড ব্যবহারের সুযোগ দেয়ায় এসব দেশকে অভিযুক্ত করেছে বাহিনীটি। আইআরজিসি জানায়, তারা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে কুয়েতের ক্যাম্প আরিফজান, আলী আল-সালেম বিমানঘাঁটি, মিনা আল-আহমাদি বন্দরে মার্কিন নৌ স্থাপনা এবং বাহরাইনে সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে।

বাহরাইনি কর্তৃপক্ষ বারবার বিমান হামলার সাইরেন বাজায়। এদিকে কুয়েতি বাহিনী জানায়, তারা ছুটে আসা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রতিহত করছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আরও জানিয়েছে, বন্দর আব্বাস-রুদান পরিবহন পথের দুটি সেতুতে নতুন করে ক্ষতিসাধন হয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, শুক্রবার হরমোজগান প্রদেশে চালানো হামলায় অন্তত আটজন বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

এদিকে ইরানের জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা মেজর জেনারেল মোহসেন রেজায়ি বলেছেন, মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে তেহরান ‘নিজের সংযত সামরিক অবস্থান পরিত্যাগ করবে’। আইআরআইবি বার্তা সংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী রেজায়ি বলেন, ‘ইরান আর নিজেকে প্রতিশোধমূলক ও যতটুকু হামলা তার সমপরিমাণ জবাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখবে না এবং কোনো রাজনৈতিক সীমান্তই নিরাপদ থাকবে না।’

তিনি বলেন, ‘এতদিন পর্যন্ত আমরা যুদ্ধ সম্প্রসারণ বা কোনো আগ্রাসন চালানোর দিকে মনোনিবেশ করিনি। এতদিন লক্ষ্য ছিল প্রতিরোধ, সংঘাতের অবসান।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘যুদ্ধের সময় আলোচনার নীতি শেষ হয়ে গেছে।’ সাম্প্রতিক এই পাল্টাপাল্টি হামলায় বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত জ্বালানি করিডোরের চলাচল ব্যাহত হয়েছে।

জাহাজ ট্র্যাকিং প্ল্যাটফর্ম মেরিনট্রাফিকের তথ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। পর্যবেক্ষক সংস্থাটি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার এই নৌপথ দিয়ে মাত্র আটটি জাহাজ চলাচল করেছে। আগের দিন এই সংখ্যা ছিল ১৫টি।

এএম