ভারতের পরমাণু কেন্দ্রের তথ্য ফাঁস; ডার্ক ওয়েবে ছড়ালো হাজারো নথি

কুড়ানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে সমুদ্রসৈকতে টহল দিচ্ছে পুলিশ
কুড়ানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্পের কাছে সমুদ্রসৈকতে টহল দিচ্ছে পুলিশ | ছবি: রয়টার্স
0

ভারতের বৃহত্তম পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র কুড়ানকুলামের হাজারো গোপন নথি সাইবার হামলার শিকার হয়ে ডার্ক ওয়েবে ছড়িয়ে পড়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স বৃহস্পতিবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।

আজ (বৃহস্পতিবার, ১৫ জুলাই) রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, র‍্যানসমওয়্যার গ্রুপ ওয়ার্ল্ড লিকস ডার্ক ওয়েবে কুড়ানকুলাম পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ নথি ফাঁস করেছে। এসব নথির মধ্যে কেন্দ্রটির বিভিন্ন অংশের নকশা ও সরবরাহকারীদের বিস্তারিত তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। গ্রুপটি জানিয়েছে, এসব তথ্য এসেছে রিলায়েন্স গ্রুপের কাছ থেকে।

পরে নিউক্লিয়ার পাওয়ার করপোরেশন অব ইন্ডিয়া জানায়, এই তথ্য ফাঁসের ঘটনায় পরমাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ পায়নি।

দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু রাজ্যের কুড়ানকুলাম পরমাণু কেন্দ্রটি ভারতের সাতটি পরমাণু কেন্দ্রের মধ্যে বৃহত্তম। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পরমাণু শক্তির সক্ষমতা বাড়ানোর উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার কেন্দ্রেও রয়েছে এটি।

কেন্দ্রটির ঠিকাদারদের একটি ভারতীয় ব্যবসায়ী অনিল আম্বানির রিলায়েন্স গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটি রয়টার্সকে জানিয়েছে, তৃতীয় পক্ষের ভারতীয় ডেটা সেন্টার সেবাদাতা ইয়োটার হোস্ট করা একটি সার্ভারে তাদের ডেটার ‘আংশিক লঙ্ঘন’ ঘটেছে। এই বিষয়ে সরকারকেও অবহিত করা হয়েছে। তবে কোন কোন তথ্য ফাঁস হয়েছে, তা রিলায়েন্স প্রকাশ করেনি।

স্বাধীন সাইবার নিরাপত্তা গবেষক রাকেশ কৃষ্ণান প্রথম রয়টার্সকে এই তথ্য ফাঁসের বিষয়ে সতর্ক করেন। তিনি জানান, এই কেন্দ্রের সংক্ষিপ্ত রূপ ‘কেকেএনপি’ লিখে অনুসন্ধান করলে ১৪ দশমিক ৩ গিগাবাইটের প্রায় ১৯ হাজার নথি পাওয়া যাচ্ছে, যা গত ১১ জুন থেকে অনলাইনে ছড়িয়ে রয়েছে।

রয়টার্স নথিগুলো পর্যালোচনা করে দেখেছে, সেগুলোর তারিখ ২০১৬ সাল থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময়ের। তবে এসবের সত্যতা যাচাই করা যায়নি। নথিগুলোতে কিছু নকশা ও সরবরাহকারীর বিস্তারিত ছাড়াও বৈঠক ও পরিদর্শনের রেকর্ড, যন্ত্রপাতির পর্যালোচনা এবং বিমা পলিসির তথ্য রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

আরও পড়ুন:

ওয়ার্ল্ড লিকস ওয়েবসাইটে থাকা রিলায়েন্সের মোট ৮ লাখ ৫৮ হাজার নথির মধ্যে এই ১৯ হাজার নথিকেই সবচেয়ে স্পর্শকাতর বলে মনে করা হচ্ছে।

২০১৮ সালে রিলায়েন্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার কুড়ানকুলাম কেন্দ্রের ইউনিট ৩ ও ইউনিট ৪-এর অবকাঠামো নকশা ও নির্মাণের চুক্তি পায়। ইউনিট দুটির নির্মাণকাজ এখনো চলছে। আগামী বছরের মধ্যে এগুলো চালু হওয়ার কথা এবং যৌথভাবে ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার কথা।

নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের জ্যেষ্ঠ পরিচালক নিকোলাস রথ রয়টার্সকে বলেন, এই তথ্য ফাঁসের ঘটনা কেন্দ্রটির নিরাপত্তার জন্য ‘গুরুতর’ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই সংস্থাটি বিভিন্ন সরকারকে পরামর্শ দেয় এবং পরমাণু নিরাপত্তায় দেশগুলোর প্রস্তুতি নিয়ে মানদণ্ড নির্ধারণ করে। এই ঘটনা ভারতে সাইবার হামলা বৃদ্ধির বিষয়টিকেও সামনে এনেছে, যেখানে অনেক প্রতিষ্ঠানই এ ধরনের হুমকি মোকাবিলায় প্রস্তুত নয়।

পরমাণু কেন্দ্র চালু ও পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান নিউক্লিয়ার পাওয়ার করপোরেশন অব ইন্ডিয়া রিলায়েন্সের সঙ্গে এই বিষয়ে যোগাযোগ রাখছে। ভারতের প্রধান সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা ইন্ডিয়ান কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (সিইআরটি-ইন) ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক সূত্র রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছে। বিষয়টির স্পর্শকাতরতার কারণে ওই সূত্র নিজের পরিচয় প্রকাশ করেনি।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার করপোরেশন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, প্রকাশিত তথ্যগুলো শুধু সাধারণ সেবামূলক স্থাপনার সঙ্গে সম্পর্কিত। এর সঙ্গে পরমাণু নিরাপত্তা বা পরমাণু নিরাপত্তা সংক্রান্ত কোনো সিস্টেমের সম্পর্ক নেই।

এর আগে নাইকি ও ভারতের টাটা গ্রুপকেও লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালিয়েছিল সুপরিচিত এই র‍্যানসমওয়্যার গ্রুপ ওয়ার্ল্ড লিকস। রিলায়েন্সের তথ্য ফাঁসের বিষয়ে রয়টার্সের প্রশ্নের কোনো জবাব দেয়নি গ্রুপটি। সাধারণত মুক্তিপণ দিতে অস্বীকার করলে তারা তাদের ওয়েবসাইটে চুরি করা কর্পোরেট তথ্য প্রকাশ করে। বিশেষায়িত ব্রাউজার ছাড়া এই ওয়েবসাইটে প্রবেশ করা যায় না।

গত মাসে ওয়ার্ল্ড লিকস রয়টার্সকে জানিয়েছিল, টাটা গ্রুপের ফাইলের জন্য তারা ১৫ লাখ ডলার মুক্তিপণ দাবি করেছে। এসব ফাইলে অ্যাপল ও টেসলার মতো ক্লায়েন্টদের গোপনীয় যন্ত্রাংশের নকশা রয়েছে। টাটা তাদের দাবি ‘উপেক্ষা’ করায় এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে বলে জানায় তারা।

এএম