দীর্ঘদিন ধরে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির অভিজ্ঞতা থাকা দেশটিতে এখন অনেক তরুণ-তরুণী কম সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন, আবার অনেকে সন্তান না নেয়ার পথও বেছে নিচ্ছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিক্ষা বিস্তার, জন্মনিয়ন্ত্রণসামগ্রীর সহজলভ্যতা, সন্তান লালন-পালনের বাড়তি খরচ এবং কর্মজীবনকে অগ্রাধিকার দেয়ার প্রবণতা—সব মিলিয়ে এই পরিবর্তন ঘটছে।
বেঙ্গালুরুর জনসংযোগ প্রতিষ্ঠান-সংশ্লিষ্ট ৪১ বছর বয়সী নিধি আগারওয়াল জানান, বিয়ের পর তিনি ও তার সঙ্গী সন্তান না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। আল-জাজিরাকে তিনি বলেন, ‘আমরা ক্যারিয়ার ও এমন প্রতিষ্ঠান গড়ার দিকে মন দিতে চেয়েছি, যা সমাজে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।’ তবে এই সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ ছিল না। পারিবারিক চাপ ছিল বলেও জানান তিনি।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য, বর্তমান প্রজন্মের বহু নারী বিয়ে ও সন্তানকে জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে দেখছেন না। বেঙ্গালুরুর স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ জ্যোৎস্না মিরলে বলেন, ‘আগের প্রজন্মের তুলনায় আজকের নারীরা বেশি শিক্ষিত, আর্থিকভাবে বেশি স্বাধীন এবং নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে বেশি সক্ষম। তার মতে, ৩০ থেকে ৪০ বছর বয়সী অনেক নারী এখন ভাবছেন, সন্তান নিলে তা সত্যিই তাদের জীবনে মূল্য যোগ করবে কি না।’
কর্মজীবনের বাস্তবতাও বড় ভূমিকা রাখছে। অনেক দম্পতি সন্তান নেয়ার সময় নির্ধারণ করছেন চাকরি, পদোন্নতি বা আর্থিক অবস্থার সঙ্গে মিলিয়ে। কেউ কেউ আবার ডিম্বাণু সংরক্ষণের পথও বেছে নিচ্ছেন, যাতে ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে মাতৃত্বের চাপ না থাকে। ভারতে এখন ২ হাজারের বেশি ফার্টিলিটি সেন্টারে ডিম্বাণু সংরক্ষণের সুবিধা রয়েছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিও সন্তান নেয়ার সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলছে। ভারতের পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত এপ্রিলে দেশটির ভোক্তা মূল্যস্ফীতি টানা ষষ্ঠ মাসের মতো বেড়ে ৩ দশমিক ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের তথ্য বলছে, ২০২৫ সালে ভারতে গড় বার্ষিক আয় ছিল ২ হাজার ৮৭৮ ডলার। অন্যদিকে, জীবনযাত্রার ব্যয়বিষয়ক ডেটাবেইস নমবিওর হিসাবে, ২০২৬ সালের জুনে ভারতে একজন মানুষের মাসিক ব্যয় ভাড়া ছাড়া ২৭ হাজার ৬৬৪ দশমিক ৭ রুপি বা ২৯০ দশমিক ৪০ ডলার।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, শিশু মৃত্যুহার কমে যাওয়াও জন্মহার হ্রাসের একটি কারণ। এসআরএস প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ভারতে ২০১৯ সালে প্রতি ১ হাজার জীবিত জন্মে শিশুমৃত্যু ছিল ৩০, যা ২০২৪ সালে নেমে এসেছে ২৪-এ। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, শিশুমৃত্যু কমলে পরিবারগুলো তুলনামূলক কম সন্তান নিতে আগ্রহী হয়।
ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে জন্মহারের পার্থক্যও স্পষ্ট। দেশটির দরিদ্র এবং তুলনামূলক কম শিক্ষার রাজ্য বিহারে টিএফআর সবচেয়ে বেশি, ২ দশমিক ৯। উত্তর প্রদেশে তা ২ দশমিক ৬। বিপরীতে উচ্চশিক্ষা ও তুলনামূলক ভালো স্বাস্থ্যব্যবস্থার অঞ্চল নিউ দিল্লিতে এই হার ১ দশমিক ২। দক্ষিণের তামিলনাড়ু ও কেরালায় টিএফআর ১ দশমিক ৩।
তবে জন্মহার কমার পাশাপাশি বন্ধ্যত্বের হারও বাড়ছে। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, ভারতে বন্ধ্যত্বের হার ১৯৯২-৯৩ সালে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে ২০১৫-১৬ সালে ৩০ দশমিক ৭ শতাংশে উঠেছে। চিকিৎসকদের মতে, স্থূলতা, হরমোনজনিত ভারসাম্যহীনতা এবং অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন এর পেছনে ভূমিকা রাখছে। যদিও দেশে ফার্টিলিটি ক্লিনিক বেড়েছে, এসব চিকিৎসার ব্যয়ও অনেক বেশি।
জন্মহার কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এখনো দেশজুড়ে কোনো একক নীতি ঘোষণা করেনি। তবে কয়েকটি রাজ্য মানুষকে বেশি সন্তান নিতে উৎসাহিত করতে উদ্যোগ নিয়েছে। গত মাসে অন্ধ্র প্রদেশ সরকার তৃতীয় সন্তানের জন্য ৩০ হাজার রুপি এবং চতুর্থ সন্তানের জন্য ৪০ হাজার রুপি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। গোয়া, কর্ণাটক ও তেলেঙ্গানার মতো কয়েকটি রাজ্য প্রথমবার মা-বাবা হতে ইচ্ছুক দম্পতিদের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে আইভিএফ সেন্টারও চালু করেছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষ কেন সন্তান নিতে চাইছেন না, সে প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই বেশি জরুরি। কারণ, সন্তান নেয়া বা না নেয়া এখন অনেকের কাছেই একান্ত ব্যক্তিগত এবং সচেতন সিদ্ধান্ত।





