রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি ইস্যু কেন্দ্র করে পাল্টে যাচ্ছে ভূ-রাজনীতির সমীকরণ। যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ত্রিমুখী দোলাচলে ভাসছে আন্তর্জাতিক রাজনীতি।
৩ বছর ধরে চলা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করে বিশ্বে শান্তি ফেরাতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। সেই উদ্দেশে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে টেলিফোনে কথাও বলেন তিনি। মেলে যুদ্ধবিরতির গ্রিন সিগন্যাল।
এর পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্টের অপ্রত্যাশিত আচরণ দেখছে ইউক্রেনসহ ইউরোপের দেশগুলো। রুশ প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করতে তড়িঘড়ি করে সৌদি আরবে প্রতিনিধি পাঠাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। সে বৈঠকে থাকবেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ও কূটনীতিবিদ কিথ কেলগ। যদিও, এতে থাকছে না ইউক্রেনের কোনো প্রতিনিধি।
ইউরোপকে সাইড করে রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি চুক্তির আলোচনা যেন কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছে না ইউরোপ। পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় প্যারিসে জরুরি বৈঠক ডেকেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতারাও। নিরাপত্তায় রক্ষায় প্রয়োজনে ইউক্রেন ভূ-খণ্ডে সেনা পাঠানোর ঘোষণাও দেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার।
তবে মিত্রদেশ যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎ কেন ইউরোপের সঙ্গে প্রতিপক্ষ সুলভ আচরণ করছে? তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে দেখা দিয়েছে প্রশ্ন। এ নিয়ে এক বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বিবিসি।
সেখানে বলা হয়, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন নিরাপত্তা বলয়ে রয়েছে ইউরোপের দেশগুলো। এছাড়া ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালিসহ ইউরোপের বেশিরভাগ দেশের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত মজবুত। এ পরিস্থিতিতে ইউক্রেন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিবাদে জড়ানোর যৌক্তিকতা নিয়ে ভাবছেন বিশ্লেষকরা।
ইউরোপের রাজনীতি বিশ্লেষক আরমিদা ভেন রিজ বলেন, ‘মনে হচ্ছে ইউক্রেনকে বিক্রি করে দেবে যুক্তরাষ্ট্র। ইউক্রেনের জন্য বিষয়টি খুবই হতাশাজনক। তবে এক্ষেত্রে ইউরোপের অন্যান্য দেশের কী করণীয় রয়েছে তাই এখন দেখার বিষয়।’
প্যারিস সম্মেলনে ইউরোপের দেশগুলো যে দুটি বিষয়ে আলোচনা করতে পারে তার মধ্যে একটি হলো নিজেদের সুরক্ষায় সেনা সংখ্যা আরও বাড়ানো এবং ইউক্রেনের নিরাপত্তায় অতিরিক্ত সেনা সদস্য পাঠানো।
ভালোভাবে দেখছেন না মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই ইউক্রেন ইস্যুতে পুতিনের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টি তাড়াতাড়ি সেরে ফেলতে চান তিনি। রোববার সিএনএনকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে দুজনের এ বৈঠকের মধ্যেই যে শান্তি চুক্তি প্রতিষ্ঠা হয়ে যাবে বিষয়টি এমন নয় বলেও ইঙ্গিত দেন তিনি।
বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন নিয়ে যখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব যখন তুঙ্গে, তখন ফায়দা নিচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। তবে, যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হলেও, এর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের কাছ থেকে তিনি কোন স্বার্থ হাসিল করতে পারবেন কিনা, তা নিয়েও রয়েছে বড় প্রশ্ন।
ইউরোপের রাজনীতি বিশ্লেষক আরমিদা ভেন রিজ বলেন, ‘যুদ্ধবিরতি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের পক্ষে যাবে কিনা, তা এখনি বলা যাচ্ছে না। তবে তিনি ইউক্রেনকে চাপে ফেলে যথেষ্ট ফায়দা নেবেন বলে মনে হচ্ছে। যদিও যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে বলে মনে হচ্ছে।’
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধবিরতি হোক বা না হোক, ইস্যুটি কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সম্পর্কে যে চির ধরতে শুরু করেছে, তা একপ্রকার পরিষ্কার। আর এই চির বহুদূর পর্যন্ত গড়াতে পারে বলেও আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।