সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, ‘বট’ শব্দটি এসেছে রোবট থেকে। এটি মূলত একটি বিশেষ সফটওয়্যার প্রোগ্রাম, যা ইন্টারনেটে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষের মতো আচরণ করার জন্য তৈরি করা হয়। যখন কয়েক হাজার বা লক্ষাধিক ভুয়া প্রোফাইলকে (Fake Profiles) একটি নির্দিষ্ট এজেন্ডা বা উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়, তখন তাকে সাইবার পরিভাষায় 'বট আর্মি' বা বট বাহিনী বলা হয়।
আরও পড়ুন:
বট বাহিনীর প্রকারভেদ: এরা মূলত কত ধরনের হয়? (Types of Social Media Bot Army)
ইন্টারনেট ও সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয় এই ট্রল বা বট বাহিনী সাধারণত দুই ভাগে কাজ করে:
১. অটোমেটেড বা স্বয়ংক্রিয় বট (Automated Bots): এগুলো সম্পূর্ণ কম্পিউটার ও কোডিং চালিত সফটওয়্যার। কোনো পোস্টে নির্দিষ্ট কোনো কিওয়ার্ড (Keywords) যেমন; ব্যক্তি, দল বা দেশের নাম দেখলেই এরা প্রোগ্রাম অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে কমেন্ট বক্সে আগে থেকে সেট করা লেখা পেস্ট করে দেয়। বর্তমানে এর সাথে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বট প্রযুক্তি (AI Bot Technology) যুক্ত হওয়ায় এরা আরও নিখুঁতভাবে মানুষের মতো প্রাসঙ্গিক ও আলাদা আলাদা কমেন্ট তৈরি করতে পারে।
২. হিউম্যান ট্রল আর্মি (Human Troll Army): প্রযুক্তিগতভাবে এরা রোবট বা সফটওয়্যার নয়, এরা আসল মানুষ। তবে এরা নিজেদের আসল পরিচয় লুকিয়ে ছদ্মনাম ও ভুয়া আইডি ব্যবহার করে। এদের মূলত নির্দিষ্ট অর্থ বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। একেকজন মানুষ ১০ থেকে ২০টি আইডি নিয়ন্ত্রণ করে এবং নির্দেশ পাওয়ামাত্রই দল বেঁধে কোনো পেজ বা লিংকে গিয়ে সাইবার আক্রমণ (Cyber Attack) চালায়।
আরও পড়ুন:
সোশ্যাল মিডিয়ায় বট বাহিনী যেভাবে কাজ করে (How Bot Armies Influence Social Media)
বট বাহিনী সাধারণত তিনটি প্রধান মনস্তাত্ত্বিক ও কারিগরি কৌশলে সমাজ ও ইন্টারনেটের তথ্য নিয়ন্ত্রণ করতে চায়:
জনমত নিয়ন্ত্রণ ও ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট (Bandwagon Effect): কোনো একটি সংবেদনশীল ঘটনা ঘটার পর জনমত কোন দিকে যাবে, তা এরা নিয়ন্ত্রণ করে। শত শত পজিটিভ বা নেগেটিভ কমেন্ট করে এরা সাধারণ মানুষের চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। মানুষ যখন দেখে একটি বিষয়ে সবাই একদিকে কথা বলছে, তখন সে-ও অবচেতনভাবে ভাবতে শুরু করে যে ওটাই বোধ হয় ঠিক।
চরিত্রহনন ও সাইবার বুলিং (Cyber Bullying & Defamation): কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানি করতে এদের লেলিয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার ভুয়া আইডি থেকে যখন একই ভাষায় গালিগালাজ বা অপবাদ দেওয়া হয়, তখন সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে সেটাকে সত্যি মনে করে।
সমন্বিত রিপোর্ট বা সাইবার অ্যাটাক (Coordinated Inauthentic Behavior): ফেসবুক বা মেটার ভাষায় একে বলা হয় ‘কোঅর্ডিনেটেড ইনঅথেনটিক বিহেভিয়ার’। কোনো জনপ্রিয় পেজ, গ্রুপ বা আইডি বন্ধ করে দেওয়ার জন্য এরা একসঙ্গে হাজার হাজার স্প্যাম রিপোর্ট (Spam Report) মারে। এতে ফেসবুকের অ্যালগরিদম বিভ্রান্ত হয়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই আইডিটি সাময়িক বা স্থায়ীভাবে ব্লক করে দেয়।
আরও পড়ুন:
আসল মানুষ নাকি বট? চেনার ৪টি পেশাদার উপায় (How to Identify Fake Social Media Bots)
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো আইডি আসল নাকি বট, তা বট অ্যাকাউন্ট চেনার নিয়ম (How to Detect Bot Accounts) জানা থাকলে সহজেই ধরা সম্ভব:
১. অস্বাভাবিক দ্রুত কমেন্ট: কোনো নিউজ বা পোস্ট পাবলিশ হওয়ার মাত্র ৫ সেকেন্ডের মধ্যে যদি ১০০ বা তার বেশি কমেন্ট চলে আসে, তবে বুঝবেন এটি বটের কাজ। একজন মানুষের পক্ষে এত দ্রুত পুরো পোস্ট পড়ে কমেন্ট করা অসম্ভব।
২. হুবহু একই কমেন্ট: যদি ১০-১৫ জন আলাদা আলাদা আইডির কমেন্ট বা লেখার ভাষা হুবহু একই রকম (কপি-পেস্ট) হয়, তবে তা নিশ্চিতভাবে বটের কাজ।
৩. রহস্যময় প্রোফাইল ও টাইমলাইন: এই আইডিগুলোর সাধারণত কোনো বাস্তব অস্তিত্ব বা ব্যক্তিগত জীবন থাকে না। প্রোফাইল পিকচারে কোনো সেলিব্রিটি, ফুল, ল্যান্ডস্কেপ বা পাখির ছবি থাকে। টাইমলাইনে নিজস্ব কোনো পোস্ট বা স্ট্যাটাস থাকে না, কেবল অন্যের পোস্ট শেয়ার করা থাকে।
৪. অস্বাভাবিক ফ্রেন্ডলিস্ট: এদের ফলোয়ার বা ফ্রেন্ডলিস্টে কোনো সামঞ্জস্য থাকে না এবং বেশিরভাগ ফ্রেন্ডই অন্যান্য ভুয়া অ্যাকাউন্ট হয়ে থাকে।
আরও পড়ুন:
একনজরে সোশ্যাল মিডিয়া বট বাহিনী ও তাদের কার্যপ্রক্রিয়া
বট বাহিনীর প্রকার (Type of Bot Army)
কার্যপ্রণালী ও বৈশিষ্ট্য (How It Works)
প্রধান লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য (Main Objective)
অটোমেটেড বা এআই বট
(Automated / AI Bots)সম্পূর্ণ কম্পিউটার কোডিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত। সুনির্দিষ্ট কিওয়ার্ড দেখামাত্রই চোখের পলকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রাসঙ্গিক কমেন্ট করতে পারে।
মিথ্যা তথ্য বা সাইবার প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে জনমতকে অবচেতনভাবে প্রভাবিত করা (ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট)।
হিউম্যান ট্রল আর্মি
(Human Troll Army)টাকা বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে নিয়োজিত আসল মানুষ। এরা একেকজন ছদ্মনামে ১০-২০টি ভুয়া আইডি নিয়ন্ত্রণ করে দলগত আক্রমণ চালায়।
সমন্বিত সাইবার অ্যাটাক
(Coordinated Behavior)নির্দিষ্ট কোনো টার্গেট পেজ বা জনপ্রিয় আইডিতে একসঙ্গে হাজার হাজার ভুয়া অ্যাকাউন্ট থেকে স্প্যাম রিপোর্ট সাবমিট করা।
অ্যালগরিদমকে বিভ্রান্ত করে টার্গেট আইডি বা পেজটিকে ব্লক করা।
শনাক্ত করার উপায়
(How to Detect)পোস্ট করার ৫ সেকেন্ডের মধ্যে শত শত কমেন্ট আসা, আলাদা আইডিতে হুবহু একই কপি-পেস্ট লেখা এবং প্রোফাইলে নিজস্ব কোনো বাস্তব তথ্য বা ছবি না থাকা।
নিরাপত্তা টিপস: লাইক বা কমেন্টের সংখ্যা দেখে উত্তেজিত না হয়ে যেকোনো সংবেদনশীল তথ্যের সত্যতা যাচাই (Fact Check) করে নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
আরও পড়ুন:





