প্রভাবশালী মার্কিন সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট’-এর এক এক্সক্লুসিভ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী, যারা নিজ দেশে নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছেন এবং দেশে ফিরে যেতে ভীত হবেন, তাদের ভিসা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট সম্প্রতি এ নতুন বিধিমালার কথা জানিয়েছে, যা মূলত যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদনকে পদ্ধতিগতভাবে সীমিত করার একটি বড় পদক্ষেপ।
সম্প্রতি মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সকল দূতাবাস ও কনস্যুলেটে পাঠানো একটি অভ্যন্তরীণ নির্দেশনায় এ কঠোর নিয়ম কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ নির্দেশনা অনুযায়ী, এখন থেকে প্রতিটি নন-ইমিগ্র্যান্ট ভিসা আবেদনকারীকে কনস্যুলার কর্মকর্তার মুখোমুখি হয়ে দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।
প্রশ্নগুলো হলো- ‘আপনি কি আপনার নিজ দেশ বা শেষ অভ্যাসগত আবাসস্থলে কোনো ক্ষতি বা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়েছেন?’ আর ‘আপনি কি আপনার নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ক্ষতি বা দুর্ব্যবহারের ভয় পান?’
নির্দেশনায় স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, ভিসা পাওয়ার প্রক্রিয়া চালিয়ে যাওয়ার জন্য আবেদনকারীকে অবশ্যই দুটি প্রশ্নের উত্তরে মৌখিকভাবে ‘না’ বলতে হবে। কোনো আবেদনকারী যদি ‘হ্যাঁ’ বলেন কিংবা উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান, তবে তাকে আর কোনোভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের ভ্রমণের নথিপত্র বা ভিসা প্রদান করা হবে না।
এ নতুন নীতি কেবল ভিসা প্রাপ্তিকে কঠিন করছে না, বরং যারা বর্তমানে ভিসা আবেদন করছেন তাদের জন্য আইনি ফাঁদও তৈরি করছে। নির্দেশনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, কোনো আবেদনকারী যদি ভয় পাওয়ার বিষয়টি লুকিয়ে ভিসা পাওয়ার আশায় মিথ্যে বলে ‘না’ বলেন এবং পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে আশ্রয়ের আবেদন করেন, তবে তাকে ‘ভিসা জালিয়াতি’র দায়ে অভিযুক্ত করা হবে। এর ফলে ভবিষ্যতে তার ওপর স্থায়ীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের নিষেধাজ্ঞা বা নির্বাসনের আইনি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের মতে, অনেক বিদেশি নাগরিক ভিসা আবেদনের সময় তাদের আশ্রয়ের উদ্দেশ্য গোপন করেন, যা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ পদক্ষেপটি হুট করে নেওয়া হয়নি। গত সপ্তাহে একটি মার্কিন ফেডারেল আপিল আদালত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘সীমান্তে অনুপ্রবেশ’ সংক্রান্ত ঘোষণাটিকে বেআইনি বলে রায় দিয়েছিল, যা কার্যত নিপীড়িত মানুষের জন্য আশ্রয়ের পথ পুনরায় উন্মুক্ত করার ইঙ্গিত দিচ্ছিল।
আদালত আশ্রয়প্রার্থীদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার ওই সরকারি আদেশ আটকে দিলে ট্রাম্প প্রশাসন এখন কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে ভিসা নিয়ন্ত্রণ করে আশ্রয়ের পথ রুদ্ধ করার কৌশল নিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছে। ‘রিফিউজিস ইন্টারন্যাশনাল’-এর প্রেসিডেন্ট জেরেমি কোনিডিক এ নীতিকে নিপীড়িত মানুষের সুরক্ষার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘সম্পূর্ণ বিশ্বাসঘাতকতা’ বলে অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘আপনি যখন কাউকে সরাসরি জিজ্ঞাসা করছেন ‘‘আপনি কি নিপীড়িত?’’ এবং তারা ‘‘হ্যাঁ’’ বললে আপনি তাদের নিজ দেশে থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন, তখন বুঝতে হবে যুক্তরাষ্ট্র এখন আর নিপীড়িতদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল নয়।’
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, এ নতুন নিয়ম কার্যকর হওয়ার ফলে জার্মানির নাৎসি আমলের ইহুদি, স্নায়ুযুদ্ধের সময়ের সোভিয়েত ভিন্নমতাবলম্বী কিংবা ১৯৭০-এর দশকের ইরানি নাগরিকদের মতো মানুষরা আজকের দিনে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের সুযোগ পেতেন না।
এ বিষয়ে স্টেট ডিপার্টমেন্টের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, মার্কিন ভিসা কোনো মৌলিক অধিকার নয়, বরং এটি একটি বিশেষ সুবিধা। ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, তাদের প্রথম অগ্রাধিকার হলো জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম দিনেই ট্রাম্প নির্বাহী আদেশ ১৪১৬১-এ কঠোর অভিবাসন স্ক্রিনিংয়ের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তারই অংশ হিসেবে এর আগে ১২টি দেশের নাগরিকদের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা ও নির্দিষ্ট কিছু দেশের নাগরিকদের ওপর আংশিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। ছাত্র ভিসা বা প্রযুক্তি কর্মীদের ক্ষেত্রেও এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যাচাই-বাছাইসহ নানা কঠোরতা আরোপ করা হয়েছে।
এখন স্টেট ডিপার্টমেন্টের এই নতুন নীতি কার্যকর হওয়ায় বিশ্বজুড়ে হাজার হাজার মানুষ, বিশেষ করে সাংবাদিক, রাজনৈতিক কর্মী, সংখ্যালঘু গোষ্ঠী এবং পারিবারিক নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, যারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভিন্ন দেশে নতুন জীবন গড়ার স্বপ্ন দেখতেন।





