তবে কোনো কারণে যদি এই স্নায়ুগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তবে শরীরের এই অভ্যন্তরীণ ‘অটোমেটিক সিস্টেম’ তার নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় এ অবস্থাকেই বলা হয় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি (Autonomic Neuropathy)। এটি কোনো একক রোগ নয়, বরং স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে সৃষ্ট জটিল শারীরিক উপসর্গের এক সমষ্টি।
কীভাবে শরীরকে প্রভাবিত করে?
আমাদের মস্তিষ্ক থেকে শরীরের অভ্যন্তরীণ অঙ্গগুলোতে সংকেত পৌঁছানোর মাধ্যম হলো এই স্নায়ুসমূহ। যখন এই যোগাযোগব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটে, তখন শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে একাধিক লক্ষণ দেখা দেয়।
হৃদযন্ত্র ও রক্তচাপ: হঠাৎ চেয়ার বা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ালে মাথা ঝিমঝিম করা বা চোখ অন্ধকার হয়ে আসা (যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে অর্থোস্ট্যাটিক হাইপোটেনশন বলা হয়)। এছাড়া বিশ্রামের সময়ও হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক দ্রুত বা ধীর হতে পারে।
পাচনতন্ত্র বা হজমপ্রক্রিয়া: খাবার খাওয়ার পর পেটে তীব্র অস্বস্তি, গা গুলোনো, বমি বা পেট ফাঁপা লাগা। স্নায়ু দুর্বলতার কারণে পাকস্থলী ধীরে খালি হলে একে গ্যাস্ট্রোপ্যারেসিস (Gastroparesis) বলা হয়। এর পাশাপাশি অনিয়মিত পায়খানা (কখনো ডায়রিয়া, কখনো কোষ্ঠকাঠিন্য) দেখা দিতে পারে।
মূত্রাশয় ও যৌন সমস্যা: মূত্রাশয় বা ব্লাডারের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রস্রাব আটকে থাকা কিংবা না চাওয়া সত্ত্বেও প্রস্রাব বের হয়ে যাওয়ার (ইনকনটিনেন্স) মতো ঘটনা ঘটে। পুরুষদের ক্ষেত্রে যৌন অক্ষমতা (ইরেকটাইল ডিসফাংশন) এবং নারীদের ক্ষেত্রে যৌন অনুভূতি হ্রাস পেতে পারে।
ঘাম ও তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত ঘাম হওয়া কিংবা শরীর একেবারেই না ঘামা। এর ফলে গ্রীষ্মকালে শরীর তার স্বাভাবিক তাপমাত্রা বজায় রাখতে পারে না।
চোখে প্রতিক্রিয়া: আলো থেকে হঠাৎ অন্ধকারে গেলে চোখের মণি বা পুতুল দ্রুত মানিয়ে নিতে পারে না, ফলে রাতে গাড়ি চালানো বা অন্ধকারে স্পষ্ট দেখা কঠিন হয়ে পড়ে।
অটোনমিক নিউরোপ্যাথির পেছনে একাধিক কারণ থাকতে পারে। তবে সবচেয়ে প্রধান ও সাধারণ কারণ হলো দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস। রক্তে অতিরিক্ত শর্করা বা সুগারের মাত্রা ধীরে ধীরে সূক্ষ্ম স্নায়ুগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে ফেলে।
অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কারণ
অটোইমিউন ডিজিজ: লুপাস বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মতো রোগ, যেখানে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ভুলবশত নিজস্ব স্নায়ুকেই আক্রমণ করে।
সংক্রমণ: কিছু ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ (যেমন লাইম ডিজিজ বা শিনগ্লস)।
ওষুধ ও কেমোথেরাপি: ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কড়া ওষুধ বা টক্সিন।
অ্যামিলয়েডোসিস (Amyloidosis): অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অস্বাভাবিক প্রোটিন জমা হওয়া।
প্রতিরোধ ও করণীয়
অটোনমিক নিউরোপ্যাথি একবার দেখা দিলে স্নায়ুর ক্ষতি পুরোপুরি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে আনা কঠিন হতে পারে, তবে সঠিক ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনে এর লক্ষণগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
বিশেষ পরামর্শ: আপনার যদি ডায়াবেটিস থাকে, তবে রক্তে শর্করার মাত্রা সব সময় নিয়ন্ত্রণে রাখা হলো এই স্নায়ুক্ষতি প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ধীরে উঠুন: বসা বা শোয়া থেকে একঝটকায় না উঠে ধীরে ধীরে উঠুন, যাতে রক্তচাপ মানিয়ে নেয়ার সময় পায়।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন: একবারে বেশি না খেয়ে সারাদিনে অল্প অল্প করে বার বারবার খাবার খান।
পর্যাপ্ত পানি ও তরল গ্রহণ: চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যতালিকায় লবণ ও তরলের সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখুন।
নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা: ডায়াবেটিস বা অটোইমিউন রোগীদের ক্ষেত্রে বছরে অন্তত একবার স্নায়ুতন্ত্রের পরীক্ষা করানো উচিত।





