বিশেষ করে চিনির ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণের সে সময়টি এখন বিজ্ঞানীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি প্রসেডিংস অব দ্য ন্যাশনাল একাডেমি অব সায়েন্সের (পিএনএএস) প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভধারণ থেকে শিশুর জীবনের প্রথম দুই বছর—অর্থাৎ প্রথম ১,০০০ দিনের সময়ে কম চিনি গ্রহণ পরবর্তী জীবনে ক্যান্সারসহ কিছু গুরুতর রোগের ঝুঁকি কমার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
তবে গবেষণাটি সরাসরি প্রমাণ করে না যে কম চিনি খেলেই ক্যান্সার প্রতিরোধ করা যায়। বরং জীবনের শুরুর সময়ের খাদ্যাভ্যাস ও পরবর্তী জীবনের স্বাস্থ্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্কের ইঙ্গিত দিয়েছে এটি।
যুদ্ধের সংকট যেখানে ‘অনন্য সুযোগ’
১৯৪০ সালের জানুয়ারি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের তীব্র প্রভাব পড়েছে যুক্তরাজ্যের খাদ্য সরবরাহে। জার্মান সাবমেরিনের হামলায় সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় দেশটিতে খাদ্যসংকট দেখা দেয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার চালু করে কঠোর রেশনব্যবস্থা।
চিনি ছিল এই নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নির্দিষ্ট সীমার বেশি চিনি কেনার সুযোগ ছিল না সাধারণ মানুষের।
এই ব্যবস্থা চলে ১৯৫৩ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। রেশন তুলে নেয়ার পর যুক্তরাজ্যে চিনির ব্যবহার দ্রুত বেড়ে যায়। ফলে একই সময়ের আশপাশে জন্ম নেয়া এমন দুটি জনগোষ্ঠী তৈরি হয়, যাদের শৈশবের খাদ্যপরিবেশে বড় পার্থক্য ছিল।
বিজ্ঞানীদের কাছে এটি হয়ে ওঠে এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক পরীক্ষা’; যেখানে মানুষের জীবনে ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো খাদ্যাভ্যাস চাপিয়ে না দিয়েও ইতিহাসের ঘটনাকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যগত পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয়েছে।
৬৪ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ
চায়না এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির চেন ঝু এবং কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ ওয়েইলোং ঝাংয়ের নেতৃত্বে গবেষকেরা ইউকে বায়োব্যাংকের তথ্য ব্যবহার করেন।
১৯৫১ থেকে ১৯৫৬ সালের মধ্যে জন্ম নেয়া ৬৪ হাজার ৭৬১ জন মানুষের স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষকেরা মূলত এমন ব্যক্তিদের তুলনা করেন, যাদের জীবনের প্রথম দিকের সময়টি চিনির রেশনের মধ্যে কেটেছে এবং যারা রেশনব্যবস্থা উঠে যাওয়ার পর তুলনামূলক বেশি চিনি পাওয়ার পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন। ফল গবেষকদের জন্য ছিল উল্লেখযোগ্য।
ক্যান্সারের কয়েকটি ধরনে বড় পার্থক্য
গবেষণার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, শৈশবের কম চিনি গ্রহণ পরবর্তী জীবনে কয়েক ধরনের ক্যান্সারের তুলনামূলক কম ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
রেশন ব্যবস্থার মধ্যে বেড়ে ওঠা ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে লিভার ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৬৯ শতাংশ কম; প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৫২ শতাংশ কম; ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৪১ শতাংশ কম; কোলোরেক্টাল/রেক্টাল ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৪০ শতাংশ কম; স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৩৬ শতাংশ কম।
তবে এসব সংখ্যাকে সরাসরি ‘কম চিনি খাওয়ার কারণে ক্যান্সার কম হয়েছে’—এভাবে ব্যাখ্যা করা ঠিক হবে না। কারণ মানুষের ক্যান্সারের ঝুঁকি বয়স, ধূমপান, শরীরের ওজন, শারীরিক সক্রিয়তা, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও পরবর্তী জীবনের খাদ্যাভ্যাসসহ বহু বিষয়ের ওপর নির্ভর করে।
গবেষণাটি মূলত দেখিয়েছে, জীবনের একেবারে শুরুর সময়ের খাদ্যপরিবেশ পরবর্তী জীবনের স্বাস্থ্যঝুঁকির সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ীভাবে সম্পর্কিত হতে পারে।
শুধু ক্যান্সার নয়, বার্ধক্য নিয়েও মিলেছে ইঙ্গিত
গবেষণার আরেকটি আকর্ষণীয় দিক হলো টেলোমিয়ার। ক্রোমোজোমের প্রান্তে থাকা টেলোমিয়ারকে অনেকটা জুতার ফিতার মাথায় থাকা প্লাস্টিকের আবরণের সঙ্গে তুলনা করা যায়। এটি ক্রোমোজোমকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে এবং বয়স বাড়ার সঙ্গে সাধারণত টেলোমিয়ার ছোট হতে থাকে।
গবেষণায় দেখা যায়, জীবনের প্রথম দিকে কম চিনি গ্রহণের সঙ্গে তুলনামূলক দীর্ঘ টেলোমিয়ারের সম্পর্ক রয়েছে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, এর সঙ্গে জৈবিক বয়সে প্রায় ২.২ বছরের পার্থক্যের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
অর্থাৎ, জীবনের প্রথম দিকের খাদ্যাভ্যাস শুধু তখনকার শরীরের ওপর নয়, বহু দশক পরের বার্ধক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
আরও পড়ুন:
শিশুর স্বাদ কি বড় হয়েও থেকে যায়?
গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা এসেছে মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ওপর। শিশুকালে যে স্বাদ ও খাবারের সঙ্গে পরিচয় তৈরি হয়, তা অনেক সময় বড় হওয়ার পরও খাবারের পছন্দকে প্রভাবিত করে। ফলে ছোটবেলায় কম মিষ্টি খাবারে অভ্যস্ত হওয়া শিশুরা পরবর্তী জীবনেও তুলনামূলক কম চিনি গ্রহণ করতে পারে।
এখানে দুটি সম্ভাব্য প্রক্রিয়ার কথা উঠে এসেছে। প্রথমটি জৈবিক। জীবনের একেবারে শুরুর দিকে পুষ্টি শরীরের বিপাকক্রিয়া, অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিকাশ এবং রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। দ্বিতীয়টি আচরণগত। শৈশবে তৈরি হওয়া খাবারের পছন্দ ও অভ্যাস পরবর্তী জীবনেও বহাল থাকতে পারে।
অর্থাৎ, শিশুকে কম মিষ্টি খাবারে অভ্যস্ত করা শুধু তার বর্তমান খাদ্যাভ্যাস নয়, ভবিষ্যতের খাবারের পছন্দও প্রভাবিত করতে পারে।
প্রথম ১,০০০ দিন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
গর্ভধারণ থেকে শিশুর দ্বিতীয় জন্মদিন পর্যন্ত সময়কে স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে প্রায়ই জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বিকাশকাল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ সময়ে মস্তিষ্ক, রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, বিপাকক্রিয়া এবং বিভিন্ন অঙ্গের দ্রুত বিকাশ ঘটে।
এই সময়ে পুষ্টির ঘাটতি যেমন সমস্যা তৈরি করতে পারে, তেমনি অতিরিক্ত চিনি ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের অভ্যাসও ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই শিশুর খাদ্যতালিকায় শুধু ‘কতটা খাচ্ছে’ নয়, কী খাচ্ছে এবং কতটা চিনি গ্রহণ করছে—সেদিকেও নজর দেয়া গুরুত্বপূর্ণ।
যুদ্ধের রেশন থেকে শিক্ষা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্রিটেনে চিনির রেশন ছিল বাধ্যতামূলক। আজকের দিনে সেই পরিস্থিতি নেই। বরং সমস্যা উল্টো—শিশুদের চারপাশে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে মিষ্টি পানীয়, কেক, বিস্কুট, চকলেট, মিষ্টিজাতীয় খাবার ও নানা ধরনের অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবার।
ফলে শতবর্ষের পুরোনো সেই রেশনব্যবস্থা আজকের সমাজের জন্য একটি অপ্রত্যাশিত শিক্ষা সামনে এনেছে; শৈশবের খাবারের অভ্যাসকে ‘শুধু শৈশবের বিষয়’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
তবে গবেষণার ফলকে আতঙ্কের কারণ হিসেবে দেখারও প্রয়োজন নেই। শুধু চিনি কম খেলেই দীর্ঘায়ু নিশ্চিত হবে বা ক্যান্সার থেকে সুরক্ষা পাওয়া যাবে—এমন সিদ্ধান্ত গবেষণাটি দেয়নি।
তথ্যসূত্র: সাইন্স অ্যালার্ট





