আজ বিশ্ব সাইকেল দিবস। দিনটি আমাদের শুধু পরিবেশবান্ধব একটি বাহনের কথাই মনে করায় না, বরং এক অদৃশ্য নস্টালজিয়ায় ফিরিয়ে নিয়ে যায়। একসময় গ্রামবাংলা কিংবা মফস্বল শহরের মধ্যবিত্তের আভিজাত্য আর নির্ভরযোগ্যতার প্রতীক ছিল এই দুই চাকার বাহন। পিয়ন থেকে শুরু করে শিক্ষক, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা কিংবা শিক্ষার্থীরা; সবারই দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গী ছিল সাইকেল। প্রযুক্তির উন্নয়ন আর দ্রুতগতির জীবনে সময় বাঁচানোর তাগিদে মানুষ এখন চড়ে বসেছে যান্ত্রিক বাহনে। ফলে শহর তো বটেই, গ্রামেও এখন আর সাইকেলের সেই চেনা আওয়াজ সহজে কানে আসে না।
অথচ জলবায়ু পরিবর্তন আর তীব্র বায়ুদূষণের এই করাল গ্রাসে ঢাকা বা জেলা শহরগুলোর পরিবেশ রক্ষায় এই সাইকেল আরোহীরাই হতে পারেন নীরব ট্রাংকুইলাইজার। ঢাকা শহরে আজও যে হাজারো মানুষ সাইকেল চালান, তারা অজান্তেই শহরের কার্বন নিঃসরণ কমাতে ভূমিকা রাখছেন। নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, শুধু একটা দিবস পালনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যদি মেট্রোরেল স্টেশন বা গণপরিবহনের কেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ সাইকেল পার্কিং স্ট্যান্ড করা যায় এবং রাস্তায় আলাদা সাইকেল লেন নিশ্চিত করা যায়, তবে মানুষ যান্ত্রিক বাহন ছেড়ে আবার এই পরিবেশবান্ধব বাহনে ফিরতে উৎসাহিত হবে।
মানুষের মনস্তত্ত্ব আর সেলুলয়েডের ফ্রেমেও সাইকেলের উপস্থিতি সব সময় গভীর অর্থ বহন করেছে। শৈশবে বাবার সাইকেলের রডে চড়ে বসা, কিংবা প্রথম ব্যালেন্স শিখতে গিয়ে হাঁটু ছিলে যাওয়ার স্মৃতি কার না আছে! বিশ্ব চলচ্চিত্রেও সাইকেল এসেছে জীবনের নানা সমীকরণ হয়ে। ইতালীয় চলচ্চিত্র ‘বাইসাইকেল থিভস’-এ একটি সাধারণ সাইকেল হয়ে উঠেছিল এক শ্রমজীবী মানুষের বেঁচে থাকার শেষ সম্বল ও আত্মসম্মানের প্রতীক। আবার সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’তে সাইকেলের চাকার উল্টো প্রতিবিম্ব দেখে অপু-দুর্গার ছুটে চলার দৃশ্যটি গ্রামীণ জীবনে আধুনিকতার প্রথম ছোঁয়া আর শিশুমনের অপার বিস্ময়কে ফুটিয়ে তোলে। ঠিক একইভাবে, সৌদি আরবের চলচ্চিত্র ‘ওয়াজদা’-তে একটি মেয়ের সাইকেল পাওয়ার জেদ আসলে রক্ষণশীল সমাজের বিরুদ্ধে তার ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রতীক। এমনকি সাম্প্রতিক তামিল ছবি ‘মেইয়াঝাগান’-এ বিশ বছর আগে উপহার পাওয়া একটি সাইকেল কীভাবে একটি গোটা পরিবারের ভাগ্য বদলে দিয়েছিল, সেই মানবিক গল্প আমাদের আবেগতাড়িত করে।
আসলে সাইকেলের কোনো জাঁকজমক নেই, নেই কোনো দামি ইঞ্জিনের গর্জন। তবু এটি মানুষকে নিজের শক্তিতে ও নিজের ভরসায় পথ চলতে শেখায়। সাইকেলের সবচেয়ে বড় জীবনদর্শন লুকিয়ে আছে এর ভারসাম্যের মধ্যে। একটি সাইকেল যতক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থাকে, সে তার ভারসাম্য ধরে রাখতে পারে না, তাকে পড়ে যেতে হয়। তাকে সোজা রাখতে হলে অবিরাম সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হয়।
আমাদের জীবনটাও ঠিক এই সাইকেলের চাকার মতোই। যান্ত্রিকতার এই কর্কশ হর্ন আর প্রতিযোগিতার ইঁদুরদৌড়ের মাঝেও যদি আমরা থেমে যাই, তবে জীবনের ভেতরের ভারসাম্যটাই নষ্ট হয়ে যাবে। তাই সামান্য কাঁপতে কাঁপতে হলেও আমাদের সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে, ঠিক যেভাবে ধীরলয়ে ঘণ্টির মৃদু ধ্বনি তুলে সাইকেলটি এগিয়ে যায় তার চিরচেনা গন্তব্যে।





