এই পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশ্ন জাগে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশ কীভাবে তাদের অর্থবছর নির্ধারণ করে? বিশ্বজুড়ে কোনো সর্বজনীন অর্থবছর নেই; দেশগুলো নিজেদের জলবায়ু, ইতিহাস, করব্যবস্থা ও প্রশাসনিক সুবিধাকে প্রাধান্য দিয়েই এই সময়সূচি ঠিক করে।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশে কেন বদলে গেল অর্থবছর? (Why Bangladesh Changed Fiscal Year)
বাংলাদেশে এতদিন পর্যন্ত ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থবছর হিসাব করা হতো। তবে এতে বর্ষাকালে (Monsoon Season) উন্নয়ন কাজ শুরু হওয়ায় তড়িঘড়ি করে বাজেট শেষ করা, কাজের নিম্নমান এবং অতিরিক্ত জনদুর্ভোগের সৃষ্টি হতো।
- নতুন সময়সূচি: ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ (April to March Fiscal Year)।
- প্রধান কারণ: বর্ষাকাল শুরুর আগেই শুষ্ক মৌসুমে (Dry Season) সমস্ত অবকাঠামোগত ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের মানসম্মত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
অর্থবছর কোন দেশে কখন থেকে কখন (Country-wise Fiscal Year Details)
ভারত (India): ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ। ১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ শাসনকালে চালু হয় এবং স্থানীয় ফসলের মৌসুম ও হিন্দু পঞ্জিকার সাথে সমন্বয় রেখে এটি এখনো বহাল রয়েছে।
পাকিস্তান (Pakistan): ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে প্রশাসনিক গণনার সুবিধার্থে এই ব্যবস্থা বহাল রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন:
শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka): ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর। বৈশ্বিক বাণিজ্যের সাথে তাল মেলাতে এটি ক্যালেন্ডার বছরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
নেপাল (Nepal): ১৬ জুলাই থেকে ১৫ জুলাই (আনুমানিক)। স্থানীয় নেপালি বর্ষপঞ্জি, ধর্মীয় উৎসব ও কৃষি মৌসুমের ওপর নির্ভর করে এটি নির্ধারিত।
ভুটান (Bhutan): ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। কমনওয়েলথ ও দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর বার্ষিক অর্থনৈতিক চক্র অনুসরণ করতে এই সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে।
মালদ্বীপ (Maldives): ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর। প্রধান অর্থনৈতিক খাত পর্যটন শিল্প (Tourism Sector) পরিচালনার সুবিধার্থে এটি নির্ধারিত।
আফগানিস্তান (Afghanistan): ২১ মার্চ থেকে ২০ মার্চ। আফগান ঐতিহ্য ও স্থানীয় সৌর বর্ষপঞ্জি (Solar Calendar) অনুযায়ী এই হিসাব পরিচালিত হয়।
যুক্তরাষ্ট্র (United States): ১ অক্টোবর থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর। গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর মার্কিন কংগ্রেস যাতে বাজেট বরাদ্দের পর্যাপ্ত সময় পায়, সেজন্য ১৯৭৪ সালে এটি চালু হয়।
আরও পড়ুন:
যুক্তরাজ্য (United Kingdom): ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ (সরকারি অর্থবছর)। তবে ব্যক্তিগত আয়করের জন্য আলাদা করবর্ষ (Tax Year) চালু রয়েছে, যা ৬ এপ্রিল থেকে ৫ এপ্রিল পর্যন্ত চলে।
ফ্রান্স (France): ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর। কেন্দ্রীয় বাজেট ও প্রশাসনিক জাতীয় পঞ্জিকা একই সময়সীমায় চালিত হয়।
জার্মানি (Germany): ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর। সরকারি নথিতে একে 'হাউজহাল্টসইয়ার' (Hushaltjahr) বলা হয়, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিসাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কানাডা (Canada): ১ এপ্রিল থেকে ৩১ মার্চ। দেশের বার্ষিক সরকারি হিসাব ও রাজস্ব আহরণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এটি প্রযোজ্য।
অস্ট্রেলিয়া (Australia): ১ জুলাই থেকে ৩০ জুন। দক্ষিণ গোলার্ধের জলবায়ু ও নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি অনুসারে এই চক্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
মালয়েশিয়া (Malaysia): ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং লেনদেনের নথি সংরক্ষণের জন্য এটি ক্যালেন্ডার বছরের সাথে মেলানো।
সৌদি আরব (Saudi Arabia): ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যের গতিধারার সাথে তাল মেলাতে এটি ব্যবহৃত হয়।
আরও পড়ুন:
কেন এই পরিবর্তন ও গুরুত্ব (Why Fiscal Year Matters)
অর্থবছর মূলত একটি দেশের বাজেট প্রণয়ন ও সরকারের বার্ষিক আয়-ব্যয়ের হিসাব চূড়ান্ত করার নির্দিষ্ট সময়সীমা। বিশ্বজুড়ে কোনো সর্বজনীন অর্থবছর নেই। বাংলাদেশ এ নতুন 'এপ্রিল-মার্চ' সময়সীমা চালুর ফলে শুষ্ক মৌসুমেই দেশের বড় বড় অবকাঠামোগত প্রকল্পের কাজ শেষ করা সম্ভব হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থবছরের সময়সীমা ও পটভূমি
একনজরে: দেশভিত্তিক অর্থবছর, শুরুর ও শেষের সময়সূচি এবং এই সময়সীমা নির্ধারণের মূল কারণ
বাংলাদেশ (Bangladesh)
১ এপ্রিল – ৩১ মার্চ
পরিবর্তিত নতুন অর্থবছর
বর্ষার আগে অবকাঠামোগত কাজ শেষ করা, গুণগত মান বৃদ্ধি ও জনদুর্ভোগ কমানো।
ভারত (India)
১ এপ্রিল – ৩১ মার্চ
এপ্রিল–মার্চ চক্র
১৮৬৭ সালে ব্রিটিশ শাসন আমলের সঙ্গে মিল এবং হিন্দু পঞ্জিকা ও ফসলের মৌসুম বিবেচনা।
পাকিস্তান (Pakistan)
১ জুলাই – ৩০ জুন
জুলাই–জুন চক্র
১৯৪৭ সালে স্বাধীনতার পর থেকে প্রশাসনিক ও আর্থিক হিসাবের সুবিধার্থে বহাল।
শ্রীলঙ্কা (Sri Lanka)
১ জানুয়ারি – ৩১ ডিসেম্বর
ক্যালেন্ডার বছর
বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্য রাখা এবং বাৎসরিক হিসাব সহজে সম্পন্ন করা।
নেপাল (Nepal)
১৬ জুলাই – ১৫ জুলাই (আনুমানিক)
স্থানীয় বর্ষপঞ্জি
নেপালি পঞ্জিকা, দেশের কৃষি মৌসুম এবং ধর্মীয় উৎসবের সময়কাল।
ভুটান (Bhutan)
১ জুলাই – ৩০ জুন
জুলাই–জুন চক্র
দক্ষিণ এশিয়া ও কমনওয়েলথভুক্ত বিভিন্ন দেশের প্রশাসনিক ব্যবস্থার সাথে মিল রাখা।
মালদ্বীপ (Maldives)
১ জানুয়ারি – ৩১ ডিসেম্বর
ক্যালেন্ডার বছর
আন্তর্জাতিক ট্যুরিজম (পর্যটন) খাতের বার্ষিক পরিকল্পনা ও বাণিজ্যের সুবিধা।
আফগানিস্তান (Afghanistan)
২১ মার্চ – ২০ মার্চ
সৌর বর্ষপঞ্জি
ঐতিহ্যগত ফার্সি বা সৌর বর্ষপঞ্জি (Solar Calendar) অনুসরণের নীতি।
যুক্তরাষ্ট্র (USA)
১ অক্টোবর – ৩০ সেপ্টেম্বর
অক্টোবর–সেপ্টেম্বর
গ্রীষ্মকালীন ছুটির পর কংগ্রেসকে বাজেট ও বরাদ্দ পাশের অতিরিক্ত সময় দেওয়া (১৯৭৪ সাল থেকে)।
যুক্তরাজ্য (UK)
১ এপ্রিল – ৩১ মার্চ
এপ্রিল–মার্চ
১৭৫২ সালের ক্যালেন্ডার পরিবর্তন ও ঐতিহাসিক লেডি ডে (Lady Day) ভিত্তিক ট্যাক্স গণনা।
ফ্রান্স (France)
১ জানুয়ারি – ৩১ ডিসেম্বর
ক্যালেন্ডার বছর
সরকারি বাজেট ও জাতীয় বর্ষপঞ্জি একই সঙ্গে পরিচালনা করার সুবিধা।
জার্মানি (Germany)
১ জানুয়ারি – ৩১ ডিসেম্বর
ক্যালেন্ডার বছর
কেন্দ্রীয় বাজেট 'হাউজহাল্টসইয়ার' অনুসরণ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিসাবের সাথে সমতা।
কানাডা (Canada)
১ এপ্রিল – ৩১ মার্চ
এপ্রিল–মার্চ
কেন্দ্রীয় সরকারের ব্যয়, রাজস্ব সংগ্রহ ও বার্ষিক সরকারি আর্থিক হিসাবের বাধ্যবাধকতা।
অস্ট্রেলিয়া (Australia)
১ জুলাই – ৩০ জুন
জুলাই–জুন চক্র
দক্ষিণ গোলার্ধের জলবায়ু মৌসুমী চক্র এবং বাজেট বরাদ্দের নির্দিষ্ট অর্থনৈতিক পঞ্জিকা।
মালয়েশিয়া (Malaysia)
১ জানুয়ারি – ৩১ ডিসেম্বর
ক্যালেন্ডার বছর
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেনের নথিপত্র সংরক্ষণের সহজীকরণ।
সৌদি আরব (Saudi Arabia)
১ জানুয়ারি – ৩১ ডিসেম্বর
ক্যালেন্ডার বছর
বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সাথে পূর্ণ সামঞ্জস্য।
দেশের নাম (Country)
অর্থবছরের সময়সীমা (Fiscal Period)
ধরণ / বিভাগ (Category)
মূল কারণ ও ইতিহাস (Background & Reason)
(করবর্ষ: ৬ এপ্রিল – ৫ এপ্রিল)




