অগ্রাধিকারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ও অলাভজনক প্রকল্প এগিয়ে নেবে না সরকার

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার | ছবি: এখন টিভি
0

অর্থনৈতিকভাবে টেকসই নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে না, পরিবেশগত দিক থেকে গ্রহণযোগ্য নয় এবং সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়— এমন উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন না দেওয়া ও বাদ দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয়ের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার ইতোমধ্যে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (আরএডিপি) আওতাধীন প্রকল্পগুলো তাদের নির্বাচনি ইশতেহার ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা যাচাইয়ের কাজ শুরু করেছে।

সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ লাখ কোটি টাকার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) অনুমোদন দেওয়া হয়।

সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করে যেগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি নেই, সেগুলো বাদ দিয়ে উন্নয়ন অগ্রাধিকার পুনর্গঠন করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আমরা প্রায় ১৩শ’ প্রকল্প উত্তরাধিকার হিসেবে পেয়েছি। যার মধ্যে অনেকগুলো প্রয়োজনীয় অগ্রাধিকার বিবেচনা না করেই নেওয়া হয়েছিল। আবার কিছু প্রকল্পে অদক্ষতা, অপচয় এমনকি দুর্নীতির সংশ্লিষ্টতাও ছিল। আমরা প্রতিটি প্রকল্প পর্যালোচনা করছি। জনগণ বা অর্থনীতির জন্য যেগুলো উপকারী নয়, সেগুলো বাদ দেওয়া হবে।’

মন্ত্রী বলেন, ‘যেসব প্রকল্প বাস্তবায়নের একটি নির্দিষ্ট পর্যায় অতিক্রম করেছে, সেগুলোর কাজ পুরোপুরি শেষ করলে দেশের জন্য তা অর্থবহ অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে কি না, সেটিও পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। কোনো প্রকল্প সম্পন্ন করেও দেশ ও জনগণের কাজে না আসলে তা চালিয়ে যাওয়ার কোনো যুক্তি নেই।’

তিনি বলেন, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও মানবসম্পদ উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের প্রোগ্রামিং বিভাগের সদস্য (সচিব) এস এম শাকিল আখতার বাসস’কে বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আওতায় চলমান ১৩শ’টিরও বেশি প্রকল্প খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এসব প্রকল্প সরকারের নির্বাচনি ইশতেহার ও অগ্রাধিকারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা যাচাই করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো প্রকল্পে যদি প্রায় ৭০ শতাংশ আর্থিক অগ্রগতি হয়ে যায়, তাহলে সেটিকে অকার্যকর বিবেচনায় বাতিল করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে যেসব প্রকল্প প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে বা ১০ থেকে ১৫ শতাংশ অগ্রগতি হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব।

শাকিল আখতার বলেন, পরিকল্পনা কমিশনের সংশ্লিষ্ট খাতগুলো থেকে চলমান প্রকল্পের তথ্য চাওয়া হয়েছে এবং কিছু তথ্য ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। সব তথ্য হাতে এলে বোঝা যাবে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো সরকারের অগ্রাধিকারের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বাসস’কে বলেন, অর্থনৈতিকভাবে অলাভজনক ও নির্বাচনি ইশতেহারের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ প্রকল্পগুলো পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। তবে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ চলমান প্রকল্প হঠাৎ বন্ধ না করে পুনর্বিন্যস্ত করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।

উন্নয়ন প্রকল্প পর্যালোচনায় সরকারের উদ্যোগ নিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার সবসময় এক হয় না। প্রকল্প নির্বাচন ও বাস্তবায়নের সময় বিষয় দুটি আলাদাভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এক জিনিস, আর অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত আরেক জিনিস।

ড. এনামুল বলেন, কিছু প্রকল্প স্পষ্টতই রাজনৈতিক প্রকৃতির। কয়েক বছর বাস্তবায়নের পর সেগুলো হঠাৎ বন্ধ করে দিলে বড় ধরনের ঝুঁকি ও বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, কোনো প্রকল্প যদি চার থেকে সাত বছর ধরে চলে, তাহলে হঠাৎ বন্ধ করা সমীচীন নাও হতে পারে। তবে কার্যপরিধি ও বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন এনে সমন্বয়ের মাধ্যমে প্রকল্পগুলোকে নতুনভাবে সাজানো যায়।

বিআইডিএস মহাপরিচালক বলেন, ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয় এবং বিরোধী দলগুলোর আগের প্রস্তাবনা থেকেও পুরোপুরি আলাদা নয়।

তিনি বলেন, আমাদের নির্বাচনি ইশতেহার আকাশ থেকে পড়েনি। সেখানে যেসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলো দীর্ঘদিন ধরেই জনপরিসর ও রাজনৈতিক আলোচনায় ছিল।

ড. এনামুল জোর দিয়ে বলেন, ভবিষ্যৎ প্রকল্পগুলো আরও সতর্কভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে সেগুলো থেকে জনগণ সর্বোচ্চ সুবিধা ও অর্থনৈতিক সুফল পায়।

দেশের প্রধান সমস্যা হিসেবে দুর্নীতি ও তহবিলের অপব্যবহারকে চিহ্নিত করে তিনি বলেন, আমাদের মূল সমস্যা প্রকল্প নয়। আসল সমস্যা হল প্রকল্পে দুর্নীতি ও জনগণের অর্থের অপচয়।

এই অর্থনীতিবিদ প্রকল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাব্যতার পাশাপাশি বৃহত্তর সামাজিক সুবিধার মূল্যায়নের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে আরও শক্তিশালী সামাজিক সুফল বিশ্লেষণ দরকার। আমরা এখনো প্রযুক্তিগতভাবে সঠিক ও পেশাদার সম্ভাব্যতা মূল্যায়ন যথাযথভাবে করতে পারছি না।

তিনি প্রকল্প মূল্যায়নে আরও বেশি পেশাদারিত্ব ও কারিগরি সক্ষমতা গড়ে তোলার আহ্বান জানান, যাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সরকারি অর্থের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হয়।

সম্প্রতি পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) এক অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, অতীতের দুর্নীতি, অপচয় ও সরকারি অর্থের অপব্যবহারের প্রেক্ষাপটে প্রকল্প মূল্যায়নে আরও কঠোর মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে সরকার।

তিনি বলেন, আমরা কিছু মানদণ্ড নির্ধারণ করেছি। এখন যেকোনো প্রকল্প নেওয়ার আগে দেখা হবে সেটির মূল্য আছে কি না, বিনিয়োগে প্রত্যাবর্তন রয়েছে কি না, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে কি না এবং পরিবেশগত বিষয়গুলো যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে কি না।

২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপিতে মোট প্রকল্প সংখ্যা ১৩৩০টি। এর মধ্যে রয়েছে ১১০৮টি বিনিয়োগ প্রকল্প, ৩৫টি সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প, ১২১টি কারিগরি সহায়তা প্রকল্প এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা ও কর্পোরেশনের নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত ৬৬টি প্রকল্প।

আগামী ৩০ জুন, ২০২৬-এর মধ্যে ২৮৬টি প্রকল্প শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ কর্মসূচিতে জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে ১৭০টি প্রকল্পও রয়েছে। এর মাধ্যমে জলবায়ু অভিযোজন ও সহনশীলতার বিষয়ে সরকারের অব্যাহত গুরুত্বের প্রতিফলন ঘটেছে।—বাসস

এএইচ