অচেনা অনলাইন লিংক কিংবা গুরুগম্ভীর কণ্ঠে হঠাৎ আপনার ফোনে ভুয়া সেনা সদস্য, ব্যাংক কর্মকর্তা বা সরকারি অফিসারের কল। কৌশল, ভীতি, বা অভিনব উপায়ে আপনার মোবাইলের নিয়ন্ত্রণ নিচ্ছে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক চক্র। তারপর ব্যাংক অ্যাপ বা ডিজিটাল মানি ট্রান্সফার মাধ্যম থেকে গায়েব হয়ে যাচ্ছে আপনার সঞ্চয়ের লাখ লাখ টাকা। ঘরে বসেই আপনি শিকার হচ্ছেন ডিজিটাল ডাকাতি বা ছিনতাইয়ের। এমন ঘটনা চট্টগ্রামে এতটাই আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে যে চলতি বছরই সাইবার ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছে ৯০টি। থানাগুলোতে জিডি হচ্ছে অহরহ। যা নিয়ে অনুসন্ধানে নেমে ভুক্তভোগী, পুলিশ ও আইনজীবিদের মুখোমুখি হয়ে আমরা পেয়েছি ভয়াবহ চিত্র।
পাঁচলাইশ থানাতেই গত এক মাসে মোবাইল থেকে টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগে জিডি হয়েছে অন্তত ১৫টি। কেউ লোভনীয় ফিশিং লিংকে ক্লিক করে, কেউ ওটিপি শেয়ার করে, আবার কেউ সন্তানের উপবৃত্তির টাকা পেতে ব্যাংকের তথ্য জানিয়ে খুইয়েছেন লাখ লাখ টাকা।
কাতালগঞ্জ এলাকার ব্যবসায়ী আরিফ ও তার পরিবার ডিজিটাল প্রতারণায় হারিয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা। আরিফ জানান, তিন মাস আগে তার মা বেসরকারি ব্যাংকে নতুন অ্যাকাউন্ট খোলেন। প্রতারক চক্র তার বৃদ্ধা মা থেকে কৌশলে তথ্য জেনে নেয়।
ভুক্তভোগীর ছেলে মোহাম্মদ আরিফ বলেন, ‘হঠাৎ করে ব্যাংকের নাম করে ফোন দিয়ে বলছে একটা ওটিপি যাবে তা দিতে হবে। আমি ভেবেছিলাম কিছুদিন আগে আমার আম্মা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলেছে ভেবেছিলাম সেখানে লাগবে তাই সিমটা তোলার কিছুদিন পর তারা আবার কল দিয়েছে তারপর একটা ওটিপি আসছিলো তাদেরকে দেয়ার পর দেখি টাকা নাই।’
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাধারণত পাঁচ উপায়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলা হচ্ছে মানুষকে। এর মধ্যে ব্যাংক বা বিকাশ কর্মকর্তা সেজে ওটিপি চেয়ে নেয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তথ্য জেনে নেয়া, আয়ের লোভনীয় অফার বা আপত্তিকর ভিডিওর লিংকে ক্লিক করিয়ে মোবাইলের তথ্য নিয়ন্ত্রণ নেয়া। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক নম্বর ক্লোন করা এবং ব্যাংকের কারো সহায়তায় তথ্য চুরি করে জালিয়াতির ফাঁদ তৈরি।
ভুক্তভোগীরা জানান, এমন একটা নাম্বার থেকে কল আসে দেখে বোঝায় উপায় ও নাই।
আদালত সূত্র বলছে, চট্টগ্রামে গত ৫ মাসে হ্যাকিং ও ডিজিটাল প্রতারণার অভিযোগে মামলা হয়েছে অন্তত ৯০টি। আইনজীবীদের অভিযোগ, পুলিশের তদন্ত কাজের ধীরগতির কারণে পার পেয়ে যায় অপরাধীরা। আর পুলিশ বলছে, প্রতারণা চক্রের সঙ্গে ব্যাংকের কর্মীদের সংশ্লিষ্টতার কথা।
আইনজীবী জিয়া হাবীব আহসান বলেন, ‘কোর্ট তদন্তের জন্য সিআইডি, কাউন্টার ট্যারিজম, পিবিআই, পুলিশকে দিলো তারা কখনো বলে আমাদের জনবল সংকট দেখিয়ে পরে থাকে। আর এর কারণেই দেখা যায় মামলাগুলোর কোনো সুরাহা হয় না।’
যদিও কর্মচারী বা কর্মকর্তাদের যোগসাজশের অভিযোগ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি অভিযুক্ত ব্যাংকগুলোর বেশিরভাগ কর্মকর্তা। তবে বেসরকারি এক ব্যাংকের কর্মকর্তা, এ বিষয়ে জানতে আইটি বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন।
ডাচ বাংলা ব্যাংক আগ্রাবাদ শাখার ডেপুটি ম্যানেজার আহমাদ আলমগীর সিরাজ উদ্দিন বলেন, ‘এ বিষয়ে ব্যাংকগুলোর আইটি সেক্টরগুলো বলতে পারবে আমি পারবো না।’
এ ধরনের মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকের নথিপত্র বা বিভিন্ন সরকারি সংস্থা থেকে তথ্য পেতে আইনি ও প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতা মামলার তদন্তকে বাধাগ্রস্ত করে। তবে এসব ক্ষেত্রে জনসচেতনাই বড় প্রতিরোধ বলে মনে করছেন তারা।





