জেলা পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে আন্তঃজেলা এই চক্রের ১২ সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। এর সঙ্গে উদ্ধার করা হয়েছে ১৮টি ইজিবাইকসহ বিপুল যন্ত্রাংশ। আজ (বুধবার, ২৫ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম।
তিনি বলেন, ‘এটি একটি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত চক্র। শনাক্ত এড়াতে তারা ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর পর্যন্ত পরিবর্তন করে ফেলেছে।’
এক চালকের অভিযোগে খুললো ‘নেটওয়ার্ক,’
ঘটনার সূত্র ১৮ ফেব্রুয়ারি। শহরের কোর্টপাড়া জামে মসজিদের সামনে তালাবদ্ধ অবস্থায় রাখা ইজিবাইক উধাও হয়। ভুক্তভোগী চালকের মামলায় তদন্ত শুরু করে ফরিদপুর কোতয়ালী থানা। সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে প্রথমে আলাল ফকিরকে আটক করা হয়। আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দির পর বেরিয়ে আসে পুরো চক্রের নাম-পরিচয়; এরপর একে একে গ্রেপ্তার করা হয় বাকি সদস্যদের।
আরও পড়ুন:
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন মোজাম্মেল মণ্ডল, ইলিয়াস হোসেন, আবুল হোসেন মোল্লা, তানভীর শেখ, আওয়াল বিশ্বাস, বদিউজ্জামান মোল্লা, মৃদুল মীর মালোত, মিলন খান, আশরাফ, শহীদ সিকদার, জুয়েল রানা ও রনি মিয়া। তাদের বাড়ি ফরিদপুর, শরীয়তপুর, মাগুরা ও জামালপুরে। পুলিশ বলছে, তারা দীর্ঘদিন ধরে সংঘবদ্ধভাবে চুরি ও চোরাই ইজিবাইক কেনাবেচায় জড়িত।
তদন্তে উঠে এসেছে সুপরিকল্পিত কৌশলের মধ্যে রয়েছে, নির্জন এলাকা টার্গেট করে ইজিবাইক চুরি, গোপন গ্যারেজে নিয়ে চ্যাসিস, বডি, গ্লাস, কেবিন আলাদা করা, ইঞ্জিন ও চ্যাসিস নম্বর ঘষে ফেলা/পরিবর্তন, ভুয়া সিলমোহরযুক্ত প্যাডে নতুন নম্বর বসানো ও খণ্ডিত অংশ জোড়া দিয়ে ‘রিফার্বিশড’ ইজিবাইক হিসেবে কম দামে বিক্রি।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাজারদরের চেয়ে উল্লেখযোগ্য কম দামে গাড়ি দিয়ে দ্রুত লাভ তুলত চক্রটি। অস্বাভাবিক কম দাম দেখে অনেকেই কাগজপত্র যাচাই না করেই কিনে প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
উদ্ধার: ইজিবাইক, যন্ত্রাংশ ও কাটার মেশিন
অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১৮টি ইজিবাইকের মধ্যে ১২ থেকে ১৩টি সচল, পাঁচ থেকে ছয়টি অচল (তদন্তাধীন তালিকা সমন্বয় চলছে)। এছাড়া চারটি চ্যাসিস, একটি কাটা বডি অংশ, সাতটি গ্লাস ফ্রেম, তিনটি কেবিন, দু’টি মাঝের ও দু’টি পিছনের বেড়া, দু’টি বাম্পার, একটি সকেট জাম্পার, একটি কাটার মেশিন এবং প্রায় পাঁচ ট্রাক খণ্ডিত যন্ত্রাংশ জব্দ করা হয়েছে। বোয়ালমারী, মধুখালী, নড়িয়া ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে এসব উদ্ধার করা হয়। একটি ইজিবাইক ২০২৫ সালের চুরি মামলার বলে শনাক্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন:
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে ইজিবাইক ও অটোরিকশা চালকদের ওপর হামলা-হত্যা, ছিনতাই ও চুরির প্রায় অর্ধশতাধিক ঘটনা ঘটেছে; অনেকগুলোর রহস্য উদঘাটন হয়েছে, কিছুতে তদন্ত চলছে। ইজিবাইক এখন নিম্নআয়ের মানুষের প্রধান জীবিকা—একটি গাড়ি হারানো মানে একটি পরিবারের উপার্জনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া।
পুলিশ সুপার নজরুল ইসলাম বলেন, ‘চক্রটির আরও সদস্য থাকতে পারে। অভিযান অব্যাহত আছে। অস্বাভাবিক কম দামে ইজিবাইক কিনবেন না; বৈধ কাগজপত্র যাচাই করুন।’
এলাকাবাসীর মতে, ইঞ্জিন-চ্যাসিস নম্বর ডিজিটাল ডাটাবেজে তাৎক্ষণিক যাচাই, গ্যারেজ লাইসেন্সিং কঠোর করা এবং সিসিটিভি নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ না হলে এমন চক্র নতুন কৌশলে ফের সক্রিয় হতে পারে। একইসঙ্গে ক্রেতাদের সচেতনতা-বাজারদরের তুলনায় অস্বাভাবিক কম দাম দেখলে সন্দেহ-প্রতারণা কমাতে কার্যকর হতে পারে।





