একদিকে খুন, অন্যদিকে চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি। কুমিল্লায় অপরাধের এই চিত্র প্রভাব ফেলছে মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। গত নয় মাসে ১০৪টি হত্যাকাণ্ডের তথ্য দিয়েছে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটি। প্রতি মাসে গড়ে খুন ১১টির বেশি। একই সময়ে চুরি ৩৬৮টি, ডাকাতি ৩৭, অপহরণ ১৫ এবং ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ১৭টি। অপমৃত্যুর ঘটনা ৪৫৭টি।
অপরাধের এই চিত্রের মধ্যেই আলোচনায় এসেছে মাদক ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, কোটবাড়ি ও লালমাই পাহাড় ঘিরে মাদকসেবন, কিশোরদের সঙ্ঘবদ্ধতা, আধিপত্য বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। সম্প্রতি অপ্রতিম হত্যাকাণ্ডের পর কিশোর-তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার বিষয়টিকে হতবাক করেছে মানুষকে।
স্থানীয়দের মধ্যে একজন বলেন, ‘যত ঘটনাই ঘটুক, দুই দিন পর নতুন সিন্ডিকেট আসে। এসব গডফাদাররা ছোট ছোটগুলোকে ক্লিয়ার করে দেয় এবং এসব কিশোর গ্যাংরা সাহস পায়, মাদক সিন্ডিকেট সাহস পায়।’
অন্য একজন বলেন, ‘ম্যাক্সিমাম ক্ষেত্রে আমরা যখন দেখি যে মাদকাশক্তি বা হচ্ছে ড্রাগের সঙ্গে যারা ইনভল্ভড আছে, ওদেরকে শেল্টার দেয় হচ্ছে পলিটিক্যাল বিভিন্ন পারসনরা।’
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী বলেন, ‘ক্যাম্পাসে মানে সুষ্ঠুভাবে চলাফেরা করাটাও আমাদের জন্য এখন আতঙ্ক। এই জায়গাটার নিরাপত্তার জন্য এখানে একটা দ্রুত একটা পুলিশ ফাঁড়ি দরকার এবং বনাঞ্চলের নিরাপত্তার জন্য বন কর্তৃপক্ষকে নিরাপত্তার বলয় সৃষ্টি করা উচিত।’
আরও পড়ুন:
নানা ধরনের অপরাধ বাড়ায় সাধারণ মানুষের মাঝেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ ও ভীতি। বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের নিখোঁজ হওয়ার খবরে বাড়ছে উদ্বেগ। তবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার পাশাপাশি পারিবারিক মূল্যবোধ তৈরি এবং সামাজিক প্রতিরোধও প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
আইনজীবী তৌহিদুর রহমান বলেন, ‘সামগ্রিক সমস্যার থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হলে, আমাদের পুলিশ প্রশাসনকে সংস্কার করতে হবে। পুলিশ প্রশাসনের লোকবল বাড়াইতে হবে, এক্সপার্টাইজ বাড়াইতে হবে। পাশাপাশি আমাদের মানে নাগরিকদেরকে সচেতন করতে হবে, বিশেষ করে অভিভাবকদেরকে সচেতন করতে হবে।’
মুন অ্যালার্টের নির্বাহী পরিচালক সাদাত রহমান বলেন, ‘অ্যালার্ট দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকটা ঘণ্টা, প্রত্যেকটা মিনিট, প্রত্যেকটা সেকেন্ড কাউন্ট করতে হবে। পুলিশকে দ্রুততম সময়ে ইমারজেন্সি রেসপন্স করতে হবে। সো সাধারণ যে পুলিশ রয়েছে, তাদেরকে দিয়ে কিন্তু আসলে এই মিসিং চিলড্রেন কেস রিকভার করা সম্ভব না। উন্নত দেশগুলোতে দেখবেন যে স্পেশাল ইউনিট আছে, ওদের কাজই শুধু চাইল্ড অ্যাবডাকশন, মিসিং, ট্রাফিকিং নিয়ে কাজ করা।’
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে অভিযান ও নজরদারি বাড়ানোর কথা জানান পুলিশের কর্মকর্তা।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, ‘মাদকের আধিপত্যের কারণেও দুই-একটি হত্যাকাণ্ড, মাদক চাওয়ার কারণে সন্তান বাবাকে মেরে ফেলছে—এরকম ঘটনা ঘটছে। সুতরাং মাদককে আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি, সেই সঙ্গে কিশোর গ্যাং, ছিনতাইকারী, ডাকাত এদের বিরুদ্ধেও অভিযান পরিচালনা করছি।’
মানুষের মনে নিরাপত্তার আস্থা ফেরানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ কুমিল্লায়।





