ভবদহে আবারও জলাবদ্ধতা; হাজার কোটি টাকাও হয়নি সমাধান

ভবদহের জলাবদ্ধতা
ভবদহের জলাবদ্ধতা | ছবি: এখন টিভি
0

চার দশকে ব্যয় হয়েছে হাজার কোটি টাকা। নেয়া হয়েছে একের পর এক প্রকল্প। কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয়নি যশোরের ভবদহ জলাবদ্ধতা সমস্যার। সবশেষ ২০২৫ সালে নেয়া ১৪০ কোটি টাকার নদী খনন প্রকল্পে আশায় বুক বেঁধেছিল যশোরের ভবদহের বাসিন্দারা। কিন্তু সেই আশাকে ভাসিয়ে নিয়ে গেছে কয়েকদিনের টানা বর্ষণ। ফের পানির নিচে বিস্তীর্ণ এলাকা। দুর্ভোগে শতাধিক গ্রামের মানুষ।

যেদিকে চোখ যায়, শুধু পানি আর পানি। ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি সবখানেই জলাবদ্ধতার চিত্র। টানা বৃষ্টিতে যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা এখন পানির নিচে।

ভবদহের জলাবদ্ধতা নিরসনে গত চার দশকে নেয়া হয়েছে ২১টিরও বেশি প্রকল্প। খাল খনন, নদী সংস্কার, পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নসহ বিভিন্ন কাজে ব্যয় হয়েছে হাজার কোটি টাকা। কিন্তু প্রকল্পের পর প্রকল্প শেষ হলেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি। পানিবন্দী হয়ে দুর্বিসহ জীবনযাপন এখানকার মানুষের।

স্থানীয়দের মধ্যে একজন বলেন, ‘ছয় মাস পানিতে থাকতে হয়। আর ছয় মাস শুকনায় থাকতে হয়। আমাদের এখানে কোনো ধান হয় না। যে মাছ মারতে পারে সে খাইতে পারে, যে না পারে সে খুব কষ্টে চলে।’

অন্য একজন বলেন, ‘কারো বাড়িতে দেখা যাচ্ছে হাঁটুজল, কারো মাজাজল, এমনকি কেউ কেউ ঘরে বসবাস করতেই পারছে না।’

আরও পড়ুন:

মনিরামপুরের সুজাতপুর গ্রামের গৃহবধূ বিথী রাণীর দু’টি ঘরে ঢুকেছে পানি। একটি মেটে ঘর শুকনা থাকলেও ঢেউয়ের তোড়ে ভাঙন ধরেছে ডোয়াতে। কোমর পানি ডিঙ্গিয়ে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিচ্ছেন। বিথির মতো দুর্ভোগে দিন কাটছে ওই অঞ্চলের প্রায় সকলেরই।

বিথী রাণী বলেন, ‘আমাদের থাকার জায়গা নেই। আমাদের রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া সব রাস্তায়।’

মনিরামপুরে বসবাসকারীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘চলাফেরার সমস্যা। তারপরে আমাগো তো সে ধান-চাল হয় না, তলা নিয়ে থাকে।

অন্য একজন বলেন, ‘এই জল না সরালে আমরা কীভাবে রান্না করে খাবো? এই গরু-বাছুর সব জলের পরে।’

জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪০ কোটি টাকার প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। চলছে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন ও খাল পুনঃখননসহ নানা কার্যক্রম। তবে বর্ষা এলেই আগের চিত্র ফিরে আসে, তাই প্রশ্ন উঠছে প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে। নদী খননের সময় বাঁধ দেয়ায় পলি জমে পানি প্রবাহ বন্ধ হওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্ম পরিকল্পনাকে দুষছেন ভবদহ আন্দোলনের নেতারা।

নদী তীরবর্তী বাস করা ব্যক্তিদের একজন বলেন, ‘টিআরএম যদি করা হয়, তাহলে এই নদীটা বেঁচে যাবে। আর এই নদীটা যদি বেঁচে যায়, তাহলে আমাদের এই নদীর অববাহিকায় যত মানুষ আছে সবাই আমরা বেঁচে যাবো।’

আরও পড়ুন:

ভবদহ পানি নিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, ‘যে নদী কাটা হয়েছিল সেটা ভরাট হয়ে গেছে এবং যে বাঁধ দেয়া হয়েছিল বাঁধও পরিপূর্ণভাবে অপসারণ করা হয়নি। ফলে এখন এই যে উদ্ভূত পরিস্থিতি, এজন্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বহীনতা প্রধানত দায়ী।’

পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, ভবদহের গেট খুলে দেয়া হয়েছে, ভারি বর্ষণ না হলে ওইসব এলাকা থেকে পানি দ্রুতই নেমে যাবে।

যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জি বলেন, ‘খুব বেশি পরিমাণে পানি নিষ্কাশিত হচ্ছে গেট দিয়ে। সেনাবাহিনীও তাদের জায়গা থেকে ড্রেজিং কাজ বাস্তবায়ন করছে। আশা করছি যে অচিরেই খুব স্বল্প সময়ের ভেতরে যেটুকু পানি ভবদহের ভেতরে লোকালয়ে এলাকায় থেকে গেছে, এ পানিটা খুবই নিষ্কাশিত হয়ে যাবে।’

যশোরের অভয়নগর, মনিরামপুর ও কেশবপুর এবং খুলনার ডুমুরিয়া ও ফুলতলা উপজেলার অংশবিশেষ নিয়ে এই ভবদহ অঞ্চল। মুক্তেশ্বরী, টেকা, শ্রী ও হরি এসব নদ-নদী দিয়ে এখানে পানি ওঠানামা করে। দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য টাইডাল রিভার ম্যানেজমেন্টসহ সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার দাবি ভবদহ আন্দোলনের নেতাদের।

এসএস