জিআই স্বীকৃতি পেল মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী হাজারি গুড়

হাজারি গুড়
হাজারি গুড় | ছবি: এখন টিভি
0

অবশেষে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পেল মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী ‘হাজারি গুড়’। কয়েকশত বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই খেজুরের গুড়কে জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন দিয়েছে সরকার। এর ফলে দেশের অন্যতম সুপরিচিত এ খাদ্যপণ্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ স্বীকৃতি ও আইনি সুরক্ষা লাভ করলো।

সম্প্রতি শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) ভৌগোলিক নির্দেশক ইউনিট ‘মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়’-এর নিবন্ধন সনদ প্রদান করে। সনদ অনুযায়ী, এটি বাংলাদেশের ৬৪তম জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। জেলা প্রশাসক, মানিকগঞ্জের নামে এ নিবন্ধন প্রদান করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন জেলা প্রশাসক রেহেনা আক্তার মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়কে জিআই নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে গত ১৫ জুন ২০২৬ তারিখে শিল্প মন্ত্রণালয়ের পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন আনুষ্ঠানিকভাবে জিআই নিবন্ধন সনদ প্রদান করেন।

জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মানিকগঞ্জের বিশেষ জলবায়ু, মাটির গুণাগুণ এবং স্থানীয় গাছিদের ঐতিহ্যবাহী উৎপাদন পদ্ধতির কারণে হাজারি গুড় স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছে। এর অনন্য স্বাদ, সুগন্ধ ও গুণগত মানের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরেই এ গুড়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

বিশেষ করে মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার ঝিটকা ও গোপীনাথপুর এলাকার উৎপাদিত হাজারি গুড় সারা দেশে পরিচিত। শীত মৌসুমে এসব এলাকার প্রায় ২০ থেকে ৩০টি পরিবার হাজারি গুড় উৎপাদন ও বিপণনের সঙ্গে জড়িত থাকে। স্থানীয় অর্থনীতিতেও এ শিল্পের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে।

আরও পড়ুন:

স্থানীয়দের ভাষ্য, হাজারি গুড়ের বিশেষত্ব শুরু হয় এর উৎপাদন প্রক্রিয়া থেকেই। খেজুর গাছ থেকে প্রথম কাটার যে রস সংগ্রহ করা হয়, সেই উৎকৃষ্ট মানের রস দিয়েই তৈরি করা হয় হাজারি গুড়। আগের দিন গাছে হাঁড়ি বেঁধে রাখা হয়। ভোরে সংগ্রহ করা রস দীর্ঘসময় ধরে জ্বাল দিয়ে বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাটির পাত্রে সংরক্ষণ করা হয়। এক কেজি হাজারি গুড় তৈরিতে প্রয়োজন হয় প্রায় ১০ থেকে ১২ লিটার কাঁচা রস।

অসাধারণ স্বাদ ও সুগন্ধের কারণে বাজারে হাজারি গুড়ের দামও তুলনামূলক বেশি। প্রতি কেজি হাজারি গুড় ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। চলতি মৌসুমে ঝিটকা ও গোপীনাথপুর গ্রামের ২৮টি গাছি পরিবার প্রায় কোটি টাকার গুড় বিক্রির আশা করছে।

স্থানীয়দের দাবি, মানিকগঞ্জের হাজারি গুড় শুধু দেশেই নয়, বিদেশেও সমাদৃত। লোকমুখে প্রচলিত রয়েছে, ইংল্যান্ডের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথও একসময় এই গুড় খেয়ে প্রশংসা করেছিলেন। সেই খ্যাতিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে গড়ে উঠেছে কোটি টাকার বাজার।

জিআই স্বীকৃতির ফলে হাজারি গুড়ের বাজারমূল্য আরও বৃদ্ধি পাবে বলে মনে করছেন উৎপাদক ও ব্যবসায়ীরা। পাশাপাশি নকল পণ্যের বিস্তার রোধ, ব্র্যান্ড পরিচিতি বৃদ্ধি এবং রপ্তানি সম্ভাবনা সম্প্রসারণেও এ স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে তারা আশা করছেন।

জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, ‘জিআই সনদ পাওয়ার মাধ্যমে মানিকগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী এই পণ্যের স্বকীয়তা আন্তর্জাতিকভাবে সুরক্ষিত হলো। ভবিষ্যতে রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ এবং স্থানীয় উৎপাদকদের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এ স্বীকৃতি ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করছি।’

উল্লেখ্য, ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই হলো এমন একটি স্বীকৃতি, যা কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চলের বিশেষ বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্যের ভৌগোলিক পরিচয়, সুনাম ও স্বত্ব সংরক্ষণ করে। ‘মানিকগঞ্জের হাজারি গুড়’ জিআই সনদ পাওয়ার মধ্য দিয়ে জেলার ঐতিহ্যবাহী খাদ্যপণ্য নতুন মর্যাদা অর্জন করলো এবং বিশ্ববাজারে পরিচিতি বাড়ানোর নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হলো।

এসএস