বাড়ছে দেশের মানুষের গড় আয়ু, কমছে পারিবারিক বন্ধন আর প্রবীণদের আয়

গড় আয়ূ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমছে প্রবীণদের নিরাপত্তা
গড় আয়ূ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কমছে প্রবীণদের নিরাপত্তা | ছবি: এখন টিভি
0

দেশে মানুষের গড় আয়ু বাড়ার পাশাপাশি বেড়েছে জীবনযাত্রার খরচ আর চিকিৎসা ব্যয়। অথচ বন্ধ হয়েছে কিংবা কমে গেছে প্রবীণদের আয়। কমছে পারিবারিক বন্ধনের দৃঢ়তা, দেখা দিয়েছে মূল্যবোধের অবক্ষয়। ক্রমবর্ধমান এ বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত যত্ন ও সহায়তা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ, বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

দিন ফুরায়, কেবল জালাল উদ্দিনের দুঃখ ফুরায় না। কঙ্কালসার দেহখানি চল্লিশ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছুটে চলেছেন ধুলোমাখা গ্রামীণ পথ ধরে। একবেলা খেয়ে, দুবেলা উপোস করে যে সন্তানদের বড় করেছেন— তারা আজ প্রতিষ্ঠিত। কেবল অবহেলা আর অযত্নে, জীবনের সায়াহ্নে এসে অসহায় এ বৃদ্ধ। জালাল উদ্দিন বলেন, ‘এখন ইনকাম করার চেষ্টা করছি, তারপর খাওয়ার মতো টাকা মেলে।’

টাঙ্গাইলের মধুপুরের গজারীচালা গ্রামের ভাঙা ভিটায় বসবাস দুই মানুষের। নব্বই ছুঁইছুঁই রনেশ সাংমার জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে শাল-গজারী বনে, জুমচাষে। দুর্ঘটনায় বিশ বছর আগে এক চোখ হারান, আর চিকিৎসার অভাবে ধীরে ধীরে হারিয়েছেন আরেক চোখও। অন্ধ এ মানুষটি দিনের পর দিন ক্ষুধা নিয়ে থাকেন। ভিক্ষা করে যা পান স্ত্রী খুকি মারাক—তাতেই কোনোমতে টিকে আছে জীবন।

খুকি মারাক বলেন, ‘আমাদের কেউ খোঁজ নেয় না। আমরা মারা গেলেও কেউ আসবে না আমার বাড়িতে।’

পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে মাটির হাঁড়ি-পাতিল আর খেলনা বানিয়ে সংসার চালিয়েছেন সত্তরোর্ধ্ব সুমিলা রানী পাল। এক সময় মেলা আর উৎসবের কাজেই চলতো সারা বছর। কিন্তু প্লাস্টিকের আগ্রাসনে আজ সেই পেশা প্রায় বিলুপ্ত। সুমিলা রানী পাল বলেন, ‘আগের মতো আর বিক্রি হয় না এ মাটির হাঁড়ি পাতিল।’

আরও পড়ুন:

একদিকে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে প্রবীণদের আয়। পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হওয়ায় অনেকেই পড়ছেন একাকিত্বে। গ্রামাঞ্চলে বসবাস করায় স্বাস্থ্যসেবা আর কাজের সুযোগ আরও সীমিত। তবু নতুন সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা—একটু সহানুভূতি, পরিকল্পিত সহায়তা।

গবেষণা বলছে, দেশে দ্রুত বাড়ছে ষাটোর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা। আগামী কয়েক দশকে প্রতি পাঁচজনের একজন হবেন প্রবীণ।

ময়মনসিংহ জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক রাজু আহমেদ বলেন, ‘আসলে যাদের কেউ দেখার নাই তাদের জন্য সরকারিভাবে আরা ও বেসরকারিভাবেও আশ্রয় সেন্টার আছে।’

এ বাস্তবতায় সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবা আর কর্মসংস্থানের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার তাগিদ বিশেষজ্ঞদের।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. সায়দুর রহমান বলেন, ‘চিকিৎসা দেয়া দরকার এবং এ বিষয়গুলো যদি প্রকল্পের মধ্যে না আনা হয়, তাহলে দেবো-দিচ্ছির মধ্যেই থেকে যাবে।’

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবীণদের জন্য আলাদা স্বাস্থ্যসেবা কাঠামো এখন সময়ের দাবি। জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপ দিতে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত ও মানবিক পরিকল্পনা।

জেআর