ত্রয়োদশ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর খরা; রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন

নারী ভোটার
নারী ভোটার | ছবি: এখন টিভি
1

এবারের নির্বাচনি ট্রেনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা হাতেগোনা। আসন্ন ত্রয়োদশ নির্বাচনে জামায়াতসহ বেশ কয়েকটি দলে নেই কোনো নারী প্রার্থী। বিভিন্ন দলের নারী নেত্রীরা বলছেন, সরাসরি ভোটে অংশ নিতে নারীদের প্রতি বৈষম্য কাটেনি। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন করছে না রাজনৈতিক দলগুলো। এমন বাস্তবতায় নারীর ক্ষমতায়ন বাড়াতে নির্বাচনের মাঠে তাদের গুরুত্ব দেয়ার আহ্বান নারীদের।

বাংলাদেশের দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের গল্পে অনুপ্রেরণার নাম নারী। রাজপথে আন্দোলনে নারীর বলিষ্ঠ উপস্থিতি থাকলেও নেতৃত্বের জায়গায় এখনো ভারসাম্যহীনতা রয়েছে। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থী তালিকায় চোখ রাখলেই দেখা যায় বিষয়টি। ভোটে অংশ নিতে যাওয়া নিবন্ধিত ৫১টি দলের মধ্যে অন্তত ৩০টিতেই নেই কোনো নারী প্রার্থী।

আর নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টিতেও ঠাঁই হয়নি খুব বেশি নারী প্রার্থীর। দলটি থেকে মনোনয়ন পাওয়া নারীর সংখ্যা মাত্র তিনজন। এছাড়াও জোটের সমীকরণে হতাশ হয়ে দল ছেড়েছেন বেশ কয়েকজন নারী নেত্রী। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে নারীদের দেয়া প্রতিশ্রুতি কেউ রাখেনি বলে জানিয়েছেন নারী নেত্রীরা।

সাবেক এনসিপি নেত্রী তাজনূভা জাবীন বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নের পক্ষে যারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তীতে সবচেয়ে বেশি কথা বলেছে, দেখা গেছে তারাই সবচেয়ে বেশি প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে। পুরনোদের তো আপনি চিনেনই, তারা এ পথে চলে এসেছে, আবার নতুনরা যখন একই পথে হাঁটে এটা হতাশার।’

জোটের রাজনীতি ঘিরে আসন দর-কষাকষি করে প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছে ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য। কিন্তু জামায়াত, এবি পার্টি, খেলাফত মজলিসের মতো দলগুলোতে দেয়া হয়নি কোনো নারী প্রার্থী। জামায়াত বলছে, দলটির ৪৩ শতাংশ সদস্য নারী। কিন্তু প্রার্থী নির্বাচনে তাদের এই অবস্থান কেন?

এবিষয়ে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘যে কোনো প্রার্থী নির্বাচিত করা জন্য আমাদের তৃনমূল থেকে পরামর্শ নেয়া হয়। এরপর আমরা প্রাথমিকভাবে একজনকে প্রার্থী হিসেবে ঠিক করি। নারীদের ক্ষেত্রে আমরা সামাজিক বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখি। এছাড়াও উনি প্রার্থী হতে রাজি কিনা সে বিষয়টাও দেখি। এই প্রক্রিয়ায় আমরা আমাদের প্রার্থীদের নির্ধারণ করি।’

এদিকে বিএনপির প্রার্থী তালিকায়ও আশার খবর নেই নারীদের জন্য। জোটের আসন সমঝোতার পর দলটি যে প্রার্থী তালিকা দিয়েছে তাতে মাত্র ১০ জন নারীর উপস্থিতি। যা দলটির মোট প্রার্থীর ৩ দশমিক ৫ শতাংশ। যাদের বেশিরভাগই আবার পারিবারিক বা উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছেন মনোনয়ন।

আরও পড়ুন:

বিএনপি নেত্রী নিলুফার চৌধুরী মনি বলেন, ‘জুলাই ২৪ এর আন্দোলনে যে সব নারীরা আন্দোলনে ছিলো কোথায় সে নারীরা? অথচ আন্দোলনটা নারী ছাড়া সফলই হতো না।’

তিনি আরও বলেন, ‘যারা আমাদের মতো প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ছাত্র রাজনীতি, উইম্যান ফোরাম এবং যুব ফোরামের রাজনীতি করে এরপর মূলধারার রাজনীতি করে আসছে তাদের তো কোনোভাবেই বাদ দেয়ার কথাই না।’

বিগত নির্বাচনগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট প্রার্থীর ৯৪ দশমিক ৮৫ শতাংশ পুরুষ আর ৫ দশমিক ১৫ শতাংশ ছিলো নারী প্রার্থী। সংখ্যার ভিত্তিতে সেবার অংশ নিয়েছিলেন ১০২ জন নারী। এছাড়া নবম সংসদ নির্বাচনে নারীদের অংশগ্রহণ ছিলো ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ, দশম নির্বাচনে ৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ আর একাদশ নির্বাচনে নারী প্রার্থী ছিল ৩ দশমিক ৮১ শতাংশ।

এবিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক রাশেদা রওনক খান বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারী প্রবেশ করার সঙ্গে সঙ্গে নারীকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি যে কাজটা শুরু হয় তা হলো ট্রল। এরপর শুরু হয় চরিত্র হরণের চেষ্টা। সে জায়গাটায় পরিবারগুলো ভয় পেয়ে যাচ্ছে। আর দলগুলো থেকে সে রকমের সাহায্য সহযোগিতাও পাওয়া পাচ্ছে না। ফলে একজন নারী রাজনীতির মাঠে আসলে লড়বেন কিসের আশায়? কিসের ভরসায়?

গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের নিরিখে নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে ন্যুনতম ৫ শতাংশ নারী প্রার্থীর সুপারিশ করে ঐকমত্য কমিশন। তবে এই লক্ষ্যমাত্রা পূরণে বেশিরভাগ দলই উদাসীন। এমন অবস্থায় নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে নারীদের যুক্ত করার পরামর্শ নির্বাচন বিশেষজ্ঞদের।

নির্বাচন বিশেষজ্ঞ জেসমিন টুলি বলেন, ‘১০০ আসনে বাইরোটেশনে সরাসরি নারী প্রার্থীরা নির্বাচন করবে। কিন্তু দেখা গেলো এমন কিছুই হলো না। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন দিয়ে শুরু হয়ে শেষে এসে দাঁড়ালো নারীরাই সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। আর মাঠে যারা কাজ করে তাদেরও যদি মনোনয়ন আসতো তাহলে ধীরে ধীরে এই ৫০ বছরে এ সমস্যা আমরা অনেকটা কাটাইয়া উঠতে পারতাম।’

ভোটের ময়দানে পুরনো কৌশলে অবজ্ঞা নয়, বরং অবস্থান নিরাপদ করার পাশাপাশি নারীবান্ধব রাজনীতির ধারা চলমান রাখার আহ্বান সমাজের বিভিন্নস্তরের নারীদের।

জেআর