ইরানে নতুন হামলার আশঙ্কার মধ্যেই রেজায়িকে ভ্যান্সের চিঠি

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স
মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স | ছবি: এপি
0

আসন্ন মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরপরই ইরানে তীব্র সামরিক অভিযানের হুঁশিয়ারির মধ্যে যুদ্ধ এড়াতে তেহরানকে চিঠি দিয়েছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের প্রধান মোহসেন রেজায়ির কাছে পাঠানো এই চিঠিতে শান্তি আলোচনা পুনরায় শুরুর ওপর জোর দেয়া হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা গেছে, আলোচনার মাধ্যমে দুই দেশের মতপার্থক্য কমিয়ে সম্ভাব্য নতুন হামলা ঠেকানো সম্ভব কি না, তা যাচাই করাই এই চিঠির মূল উদ্দেশ্য।

রেজায়িকে দেয়া চিঠিতে কী বার্তা পাঠিয়েছেন ভ্যান্স
দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল ও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিঠিতে সুনির্দিষ্ট কোনো শর্তের বদলে আলোচনার একটি খসড়া রূপরেখা প্রস্তাব করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ওয়াশিংটন ও তেহরান যদি একটি অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে পায়, তবে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানে বড় আকারের হামলা চালানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত থেকে বিরত রাখা সম্ভব হতে পারে। ভ্যান্স প্রস্তাব করেছেন, শিগগিরই দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি বৈঠক হতে পারে, যেখানে তিনি নিজেই মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেবেন।

গত রোববার কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে এই চিঠি রেজায়ির কাছে পৌঁছানো হয়। তবে এতে শুরু থেকেই ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে আলোচনার টেবিলে রাখার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে। ইরান এতে সম্মতি দিলে আগামী সপ্তাহেই কাতার বা তুরস্কে এই আলোচনা হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

চিঠি নিয়ে ইরানের মনোভাব ও তেহরানের সমীকরণ
এই চিঠি নিয়ে ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না জানালেও নিউ ইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে যে দেশটির শীর্ষ নেতৃত্ব এটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি উল্লেখ করেন, কূটনীতিকে এখনও সুযোগ দিচ্ছে ইরান। রেজায়ি আনুষ্ঠানিকভাবে এই চিঠির জবাব দিতে পারেন বলে জানা গেছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি জানান, চিঠিটি সরাসরি রেজায়ির কাছে পাঠানো অত্যন্ত অর্থবহ। এর মাধ্যমে বোঝা যায় ওয়াশিংটন হয়তো মনে করছে তেহরানের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্যে পরিবর্তনের ফলে রেজায়ির সঙ্গে সরাসরি আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক ফল আসার সম্ভাবনা বেশি।

ভ্যান্স কি ট্রাম্পের যুদ্ধভাবনা বদলাতে পারবেন
ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুলনায় জেডি ভ্যান্স শুরু থেকেই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের বিপক্ষে এবং তিনি আলোচনার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন বলে মার্কিন গণমাধ্যমে আলোচনা রয়েছে। তবে এই চিঠি নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে মিশ্র বার্তা দেখা গেছে। ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল জানায় যে ট্রাম্পের নির্দেশেই এই চিঠি পাঠানো হয়েছে। তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের কাছে তা নাকচ করে দাবি করেন, তিনি আলোচনার কোনো নির্দেশ দেননি, বরং ইরানে চিকিৎসা সামগ্রী পাঠানোর বিষয়ে ভ্যান্সের উদ্যোগকে অনুমোদন দিয়েছিলেন মাত্র।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির উপপরিচালক আলী ওয়ায়েজ আল জাজিরাকে বলেন, ‘ট্রাম্প সংঘাত বৃদ্ধিকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে দেখেন, অন্যদিকে ভ্যান্স হয়তো বুঝতে পারছেন যে যুদ্ধের মাধ্যমে খুব বেশি লাভ আসবে না। তবে কেবল একজন ভালো দূত দিয়ে বড় মতবিরোধ মেটানো সম্ভব নয়।’ সুইডেনের লুন্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রুজবেহ পারসি জানান, ট্রাম্প প্রশাসনে ভ্যান্সকে অপেক্ষাকৃত বিবেচনাশীল ভাবা হলেও ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের ওপর তার প্রভাব কতটা কাজ করবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা ট্রাম্পের হাতেই।

উপসাগরীয় দেশগুলোকে সতর্কবার্তা ও হামলার ঝুঁকি
আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে তীব্র সামরিক অভিযান শুরু হতে পারে জানিয়ে উপসাগরীয় মিত্রদের ইতোমধ্যে প্রস্তুতি নিতে সতর্ক করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে ইরানও কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, নতুন কোনো আগ্রাসন চালানো হলে তারা তেল স্থাপনা, সমুদ্রতলীয় ক্যাবল, ডেটা সেন্টার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা অবকাঠামো লক্ষ্য করে পাল্টা হামলা চালাবে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফের উপদেষ্টা মেহেদি মোহাম্মাদি জানান, তাদের কৌশল হল কোনো সীমারেখা না মানা।

নির্বাচনের পর মার্কিন হামলার আশঙ্কা অত্যন্ত তীব্র বলেই মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকেরা। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক মারজিয়ে কৌহি এসফাহানি আল জাজিরাকে বলেন, ‘উভয় পক্ষই এই যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয় পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসতে চাইছে। ফলে পরিস্থিতির শান্তির চেয়ে যুদ্ধের দিকে মোড় নেয়ার সম্ভাবনাই বেশি।’


এএম