উচ্চশিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে উত্তাল ইউরোপ

ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ
ফ্রান্সের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ | ছবি: গেটি ইমেজ
0

উচ্চশিক্ষা ব্যয়বহুল করে তোলার প্রতিবাদে আবারও ছাত্র আন্দোলনে উত্তাল ইউরোপের বিভিন্ন দেশ। গতকাল (মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর) ফের ফুঁসে ওঠে ফ্রান্স। রাজপথে নামে পাঁচ লাখ বিক্ষোভকারী। জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েও বিক্ষুব্ধদের দমনে হিমশিম খায় পুলিশ। আন্দোলন সহিংসতায় গড়ায় আলবেনিয়াতেও। জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয় নিয়ে স্পেনের পর ক্ষোভ দানা বাঁধছে গ্রিসে। সাম্প্রতিক সহিংসতার পর বেলজিয়ামের একটি শহরে সমাগম নিষিদ্ধ করাকে ‘স্বৈরাচারী পদক্ষেপ’ বলছে শিক্ষার্থীরা।

এক লাখ ৬১ হাজারের বেশি স্কুলশিক্ষার্থী, সঙ্গে উচ্চশিক্ষা আর বিভিন্ন পেশাজীবীদের সংগঠন মিলিয়ে চার লাখ ৮০ হাজার মানুষের বিক্ষুব্ধ পদচারণায় উত্তপ্ত পুরো ফ্রান্স।

ফ্রান্সে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের চলছে প্রায় এক মাস। মঙ্গলবার দেশজুড়ে বিক্ষোভে যোগ দেয় লাখ লাখ মানুষ। যোগ দেন সুইডিশ অধিকারকর্মী গ্রেটা থুনবার্গ। স্কুলে শিক্ষার পরিবেশ, শিক্ষকের ঘাটতি, শিক্ষার্থীর তুলনায় অপ্রতুল শ্রেণিকক্ষ, জরাজীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ স্কুলভবন—এমন নানা সংকটের বিরুদ্ধে ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে শিক্ষার্থীরা। প্যারিসের কাছে নান্তেস আর মন্তপারনাজিতে জলকামান, কাঁদানে গ্যাস ছুঁড়েও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের দমন করতে পারেনি দাঙ্গা পুলিশ। যদিও লিয়ন, লিলে, মার্সেইলিসহ অন্যান্য শহরে বিক্ষোভ ছিল শান্তিপূর্ণ।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমার ছাত্রছাত্রী আর এক সহকর্মীর কথাই ধরুন। তাদের ক্লাস শেষ হয় সন্ধ্যা ৭টায়। এটা বেশ শোচনীয় বিষয়, বিশেষ করে যখন সকাল ৮টায় তাদের দিন শুরু হয়।’

আরও পড়ুন: হরমুজে হামলার কৌশল বদলাচ্ছে ইরান; মার্কিন নির্বাচনের আগে তেলের দাম চড়া রাখার লক্ষ্য

শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমরা আর সহ্য করতে পারছি না। চাকরি নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত আসন বা শিক্ষক নেই। আমি এমন বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছি, যেখানে পর্যাপ্ত অধ্যাপক না থাকার কারণে প্রয়োজনীয় কোর্সগুলোও পেতাম না।’

ফ্রান্সে ক্রমবর্ধমান ঋণের চাপে, সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি ইউরো সাশ্রয়ের লক্ষ্য নিয়ে পার্লামেন্টে ব্যয় সংকোচনমূলক বাজেট পাস করাতে হিমশিম খাচ্ছে ইম্যানুয়েল ম্যাক্রোঁ সরকার। একদিকে বাজেটে ঘাটতি কমানোর দাবি, অন্যদিকে বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক স্থিরতা ফেরানোর দাবি—সবমিলিয়ে উভয় সংকটে মধ্যপন্থি প্রেসিডেন্ট। উত্তাল বিক্ষোভের জেরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের মাত্র ছয় মাস আগে, বড় চ্যালেঞ্জের মুখে, দ্বিতীয় ও শেষ মেয়াদ পূর্ণ করার পথে থাকা রাষ্ট্রপ্রধান।

বেলজিয়াম

চলতি মাসে বেলজিয়ামের লিজে শুরু হওয়া বিক্ষোভের আগুন ছড়িয়েছে রাজধানী ব্রাসেলস পর্যন্ত। ঊর্ধ্বমুখী শিক্ষা ব্যয়, আসনসংখ্যার অতিরিক্ত শিক্ষার্থী, খরচ বেড়ে উচ্চশিক্ষা নাগালের বাইরে চলে যাওয়ার মতো সংস্কার ইত্যাদির প্রতিবাদে গেলো সপ্তাহে হয় সহিংস বিক্ষোভ। সহিংসতার জেরে লিজ শহরে সমাগম নিষিদ্ধ করে জারি করা হয় কঠোর নিরাপত্তা। এতে ক্ষোভ বাড়ছে আরও।

বিক্ষোভকারীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘আমি মনে করি এটি আমাদের স্বাধীনতায় গুরুতর হস্তক্ষেপ। তিনজনের বেশি দলে আমাদের চলাচল করতে না দেয়াটা স্বৈরাচারী শাসনেরই বৈশিষ্ট্য।’

আরও পড়ুন: আরামকোতে হুথিদের হামলা; সৌদি যুবরাজের কঠোর হুঁশিয়ারি

স্পেন

আবাসন সংকট আর উচ্চ ভাড়ার বিরুদ্ধে প্রতিবেশী স্পেনে বিক্ষোভ গড়িয়েছে চতুর্থ সপ্তাহে। এ পর্যায়ে পরিস্থিতি শান্ত হলেও রাজধানী মাদ্রিদের কেন্দ্রে, খোলা আকাশের নিচেই অবস্থান করছেন বিক্ষোভকারীরা।

আন্দোলনকারীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘একটা অস্থায়ী ব্যবস্থায় বাস করছি আমরা। আমাদের বলা হচ্ছে যে শহরের কেন্দ্রে মাসে ৫০০ ইউরো দিয়ে থাকার আশা করা উচিত না। কিন্তু বিষয়টা এমন নয়। শহরের কেন্দ্র বা আশপাশ নয়, বাস্তবতা হলো- এই খরচেও কোথাওই থাকা সম্ভব হচ্ছে না।’

গ্রিস

আরেক প্রতিবেশী গ্রিসেও শিক্ষার খরচ আর জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা। দূরদূরান্তে পড়তে যাওয়া সন্তানের ঘর ভাড়া, জ্বালানির খরচ, শিক্ষা উপকরণের খরচ দিতে দিয়ে পরিবারের আর্থিক লড়াই প্রশাসনকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে রাজধানী এথেন্সে পার্লামেন্ট ভবন থেকে শহরের কেন্দ্র- সিনতাগমা চত্বর পর্যন্ত তাঁবু খাটিয়ে রাত পার করেন শিক্ষার্থীরা।

আরও পড়ুন: ১১ নভেম্বর পর্যন্ত পাকিস্তানের বিভিন্ন জেলায় ১৪৪ ধারা জারি

শিক্ষার্থীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘স্পেন-ফ্রান্সের তরুণ শিক্ষার্থীদের সুরেই কথা বলছি। মাস শেষ করার মতো টাকা হাতে থাকে না। কাজ করে যা আয় হয়, তাতে বেশিরভাগেরই কোনোমতে দিন যায়। বাড়ি ভাড়া, শিক্ষার বিপুল খরচ, খাবার-যাতায়াতসহ সব প্রয়োজন সামলানো অসম্ভব। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’

অন্য একজন বলেন, ‘আত্তিকা অঞ্চলে ৩৫ বর্গমিটারের একটা ঘরের ভাড়া ৪০০ থেকে ৫০০ ইউরো। এটা মেনে নেয়া যায় না। এর জন্য সরকার দায়ী।’

আলবেনিয়া

ব্যয়বহুল শিক্ষা, প্রতিকূল পরিবেশ, স্নাতক সম্পন্নের পর কাজের দুরাশা নিয়ে হতাশ আলবেনিয়ার শিক্ষার্থীরাও। ক্ষোভে তিরানা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ঘেরাও করে তারা। পুলিশ কাঁদানে গ্যাস আর গরম পানি ছুঁড়লে সহিংস হয়ে ওঠে বিক্ষোভ, চলে ব্যাপক ধরপাকড়।

এসএস