ফেয়ারফোর্ড থেকে বি-১বি বোমারু বিমান সরালো যুক্তরাষ্ট্র, কারণ কী?

আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে বি-১বি ল্যান্সার
আরএএফ ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটিতে বি-১বি ল্যান্সার | ছবি: সংগৃহীত
0

গত রোববার দিনভর যুক্তরাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত রয়্যাল এয়ার ফোর্সের (আরএএফ) ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটি থেকে এক ডজন বি-১বি ল্যান্সার বোমারু বিমান উড্ডয়ন করে নিজেদের মূল ভূখণ্ডে ফিরে গেছে। এর মধ্য দিয়ে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরানের ওপর মার্কিন হামলার প্রধান ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত এই ব্রিটিশ বিমানঘাঁটির তাৎক্ষণিক কার্যক্রমের অবসান ঘটলো। লন্ডনের পশ্চিমে অবস্থিত এই বিমানঘাঁটিটি ইউরোপে ভারী বোমারু বিমান পরিচালনার জন্য মার্কিন বিমানবাহিনীর একমাত্র কৌশলগত ক্ষেত্র।

আরএএফ ফেয়ারফোর্ডে ঠিক কী ঘটেছিল?
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ফেয়ারফোর্ড বিমানঘাঁটির কাছে বিস্ফোরক রাখার চক্রান্তের অভিযোগে পাঁচ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। তল্লাশির সময় তাদের গাড়ি থেকে পেট্রোল উদ্ধার করা হলেও কোনো প্রস্তুতকৃত বিস্ফোরক ডিভাইস পাওয়া যায়নি। পরে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়। এরপর গত বৃহস্পতিবার লন্ডনে ২৫ বছর বয়সী এক ব্রিটিশ-ইরানি দ্বৈত নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়, যার ওপরও এই ঘাঁটিতে হামলার পরিকল্পনার সন্দেহ রয়েছে। পরে তাকেও গত ৩ অক্টোবর জামিন দেয়া হয়।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ইঙ্গিত দিয়েছেন, এই চক্রান্তের পেছনে ইরানের ভূমিকা থাকতে পারে। যদিও তেহরান এই অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘ইরানোফোবিয়া’ বা ইরানভীতি ছড়ানোর অপপ্রচার বলে দাবি করেছে। গত সোমবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘কিছু সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা হুমকির’ কারণেই বোমারু বিমানগুলো সাময়িকভাবে অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও একে বিমানবাহিনীর নিয়মিত রোটেশন বা স্থানান্তর প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কী কী ধরনের বোমারু বিমান রয়েছে?
বর্তমানে মার্কিন বিমানবাহিনী মূলত তিন ধরনের বোমারু বিমান ব্যবহার করে থাকে, এবং চতুর্থ আরেকটি বিমান যুক্ত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে:

বি-৫২ স্ট্র্যাটোফোর্ট্রেস: এটি মার্কিন বহরের সবচেয়ে পুরোনো ও বড় বোমারু বিমান, যা ১৯৬০-এর দশকে তৈরি। এটি পারমাণবিক বোমা ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রসহ প্রায় ৩১ টন যুদ্ধাস্ত্র বহন করতে পারে।

বি-১বি ল্যান্সার: এটি শব্দের চেয়েও দ্রুতগতিসম্পন্ন (সনিক স্পিড) বোমারু বিমান। এটি প্রায় ৩৪ টন প্রচলিত ভারী অস্ত্র বহন করতে পারে, তবে এটি পারমাণবিক অস্ত্র বহন করে না। ফেয়ারফোর্ড থেকে মূলত এই মডেলের বিমানগুলোই সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

বি-২ স্পিরিট: এটি রাডার ফাঁকি দিতে সক্ষম (স্টিলথ) বোমারু বিমান। এটি পারমাণবিক ও প্রচলিত উভয় ধরনের ভারী অস্ত্র বহন করতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানতে ব্যবহৃত প্রায় ১৩ হাজার ৬০০ কেজি ওজনের ‘বাঙ্কার বাস্টার’ বোমা মূলত এই বিমান থেকেই ফেলা হয়েছিল।

বি-২১ রেইডার: এটি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী প্রজন্মের অত্যাধুনিক স্টিলথ বোমারু বিমান, যার পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন চলছে এবং ২০২৭ সালের মধ্যে এটি মার্কিন বহরে যুক্ত হবে।

এই বোমারু বিমানগুলো কোথা থেকে পরিচালিত হয়?
যুক্তরাষ্ট্রের সবগুলো বোমারু বিমান স্থায়ীভাবে দেশটির মূল ভূখণ্ডের পাঁচটি প্রধান ঘাঁটিতে (লুইজিয়ানা, উত্তর ডাকোটা, টেক্সাস, দক্ষিণ ডাকোটা ও মিসৌরি) অবস্থান করে। তবে বিদেশি অভিযানের জন্য মার্কিন বাহিনী প্রশান্ত মহাসাগরের গুয়ামের অ্যান্ডারসেন বিমানঘাঁটি এবং ভারত মহাসাগরের ডিয়েগো গার্সিয়ার মতো দূরবর্তী অগ্রবর্তী ঘাঁটিগুলো ব্যবহার করে থাকে। এছাড়া স্পেনের মরন, নরওয়ের অরল্যান্ড, জাপানের মিসাওয়া ও অস্ট্রেলিয়ার টিনডাল বিমানঘাঁটিতেও সাময়িকভাবে বোমারু বিমান মোতায়েন করা হয়। মাঝ আকাশে জ্বালানি নেয়ার সুবিধার কারণে এই বিমানগুলো সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়ে গিয়ে ৩০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে ইরানের মতো দূরবর্তী লক্ষ্যবস্তুতে সফলভাবে আঘাত হেনে আবার ফিরে আসতে পারে।

—আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম