কুমোরটুলির সরু গলিতে এখন প্রতিমার পাশাপাশি চোখে পড়ছে ক্যামেরা ও মুঠোফোন হাতে মানুষের ভিড়। কেউ বন্ধুর ছবি তুলে দিচ্ছেন, কেউ দলবেঁধে সেলফি তুলছেন। কেউ আবার প্রতিমা তৈরির বিভিন্ন পর্যায়ের ছবি ও ভিডিও ধারণ করছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশের জন্য।
মৃৎশিল্পীদের অভিযোগ, ছবি তোলার এই প্রবণতা এখন অনেক সময় মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো কারখানায় দর্শনার্থীদের ভিড় এতটাই বাড়ছে যে শিল্পীদের কাজ করাই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ছবি তোলা ঠেকাতে কোথাও প্রতিমা তৈরির জায়গার গুরুত্বপূর্ণ অংশ আড়াল করে কাজ করছেন শিল্পীরা। আবার কোথাও দর্শনার্থীদের ছবি ও ভিডিও না তোলার অনুরোধ জানিয়ে পোস্টার টাঙিয়েছে কুমোরটুলি মৃৎশিল্পী উন্নয়ন সমিতি। তবে তাতেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশের আগ্রহ
কুমোরটুলিতে ছবি তুলতে আসা অনেকের মূল লক্ষ্য প্রতিমা ও নিজেদের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা। বেশি ভিউ, লাইক ও মন্তব্য পাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও তাদের এই আগ্রহের অন্যতম কারণ।
পেশায় নার্স ঈপ্সিতা ও সুস্মিতা দুই বন্ধু কুমোরটুলিতে এসেছিলেন ছবি তুলতে। তারা জানান, ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করবেন। এতে ভিউ বাড়বে, এটাই তাদের আগ্রহের একটি কারণ। তবে ছবিতে অপরিচিত পুরুষদের মন্তব্য নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
কলকাতার কলেজছাত্রী নন্দিতা ও সপ্তপর্ণা এসেছেন আসানসোল ও মেদিনীপুর থেকে। তাদের উদ্দেশ্য কিছুটা ভিন্ন। কলকাতার পুরোনো ঐতিহ্য ও কুমোরটুলির পরিবেশ দেখতে এবং স্মৃতি হিসেবে কিছু ছবি তুলে রাখতে তারা এখানে এসেছেন।
আরও পড়ুন:
নন্দিতা ও সপ্তপর্ণার ভাষ্য, কলকাতাকে নতুন করে জানার সুযোগ হিসেবে তারা কুমোরটুলিতে এসেছেন। এখানকার ঐতিহ্য ও পরিবেশ তাদের আকৃষ্ট করেছে।
আবার ঈশিতা মণ্ডল কুমোরটুলিতে এসেছেন ভিডিও ধারণ করতে। তিনি জানান, দুর্গার আগমনকে কেন্দ্র করে তিনটি ভিডিও করেছেন। আরও কিছু ছবি ও ভিডিও ধারণের কাজ বাকি রয়েছে। সেগুলো নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে প্রকাশ করবেন।
বিদেশ থেকেও আসছেন দর্শনার্থী
শুধু কলকাতা বা ভারতের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নয়, কুমোরটুলির প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে বিদেশ থেকেও আসছেন পর্যটকেরা। যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রথমবার কুমোরটুলিতে আসা এক নারী জানান, শিল্পীদের হাতের কাজ ও প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে তিনি এখানে এসেছেন। মৃৎশিল্পীরা যেভাবে হাতে প্রতিমা তৈরি করছেন, তা তার কাছে আকর্ষণীয় লেগেছে।
তবে সবার উদ্দেশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবি প্রকাশ করা নয়। তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী হৃদ্ধিমা দাস মায়ের সঙ্গে এসেছে প্রতিমা তৈরির প্রক্রিয়া দেখতে।
হৃদ্ধিমা জানায়, প্রতিমা তৈরি ও রং করার কাজ দেখেছে। প্রতিমা ও মৃৎশিল্পীদের সঙ্গে ছবিও তুলেছে। পূজা শেষে এসব প্রতিমা আর দেখা যাবে না, তাই ছবিগুলো স্মৃতি হিসেবে রেখে দেবে।
কয়েক হাজার প্রতিমা তৈরি হয় কুমোরটুলিতে
দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কুমোরটুলিতে ছোট-বড় মিলিয়ে কয়েক হাজার প্রতিমা তৈরি হয়। কলকাতা ও আশপাশের বিভিন্ন এলাকার পূজামণ্ডপে এখানকার প্রতিমা যায়। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে কুমোরটুলির তৈরি দুর্গাপ্রতিমা পাড়ি দেয় বিদেশেও।
পূজার আগে তাই কুমোরটুলিতে স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে ব্যস্ততা। সরু রাস্তার দুই পাশে সারি সারি প্রতিমা রাখায় চলাচলের জায়গাও সংকুচিত হয়ে আসে। এর সঙ্গে দর্শনার্থী ও ছবি শিকারিদের ভিড় যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন:
মৃৎশিল্পীদের একাংশের দাবি, গত দুই-তিন বছরে কুমোরটুলিতে ছবি ও ভিডিও ধারণের প্রবণতা বেড়েছে। কেউ ভাইরাল হওয়ার আশায়, কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনুসারী বাড়াতে, আবার কেউ অনলাইন থেকে আয় করার উদ্দেশে প্রতিমার অর্ধসমাপ্ত ছবি কিংবা কয়েক সেকেন্ডের ভিডিও প্রকাশ করছেন।
শিল্পীদের মতে, এতে শুধু চলাচলে সমস্যা হচ্ছে না, তাদের কাজেও ব্যাঘাত ঘটছে।
‘বারণ করতে করতে মুখ ব্যথা হয়ে যায়’
পূজার আগে প্রতিমা তৈরির কাজ শেষ করতে অনেক শিল্পী প্রতিদিন ১৫ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় কাজ করছেন। কখনো বৃষ্টি, কখনো আবার দর্শনার্থীদের ভিড়, বিভিন্ন কারণে তাদের কাজে বিঘ্ন ঘটছে।
প্রতিমার সাজসজ্জার শিল্পী নিধির দাস বলেন, ‘অনেকেই এখানে ছবি তুলতে আসছেন এবং আমাদের অসুবিধা করছেন। তাদের বারণ করতে করতে আমাদের মুখও ব্যথা হয়ে যায়। কিন্তু কী আর করা যাবে?’
কুমোরটুলির শিল্পীদের এখন মূল লক্ষ্য নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিমার কাজ শেষ করে সেগুলো পূজামণ্ডপে পাঠানো। সেই ব্যস্ততার মধ্যেই দর্শনার্থীদের আগ্রহ ও ছবি তোলার চাপ সামলে কাজ চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাদের।





