শি-ট্রাম্প বৈঠক: বাণিজ্য যুদ্ধে আসলে জয়ী কে?

ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং
ডোনাল্ড ট্রাম্প ও শি জিনপিং | ছবি: আল জাজিরা
0

বিশ্বের শীর্ষ দুই অর্থনৈতিক শক্তি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে চলমান বাণিজ্য সংঘাত, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রতিযোগিতা নিয়ে এক অমীমাংসিত সমীকরণের সৃষ্টি হয়েছে। এক দশকের বেশি সময় পর প্রথমবারের মতো রাষ্ট্রীয় সফরে ওয়াশিংটন ডিসিতে পৌঁছেছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। সেখানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তার হাই-স্টেক্স দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হতে যাচ্ছে। এই বৈঠকের পটভূমিতে এখন মূল প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে—কয়েক বছর ধরে চলা দুই দেশের মধ্যকার এই অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য যুদ্ধে প্রকৃতপক্ষে কে জয়ী হচ্ছে?

২০২৫ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পরপরই ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর নতুন করে শুল্ক আরোপ শুরু করেন এবং একই সঙ্গে বেইজিংয়ের কাছে উন্নত এআই চিপ বিক্রির ওপর কড়াকড়ি আরোপ করেন। দুই দেশের মধ্যে পাল্টাপাল্টি শুল্কারোপ ও বাণিজ্যে স্থবিরতার কারণে ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমে যায়। তবে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কমলেও বিশ্ববাজারে সার্বিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশের অভিজ্ঞতা একেবারেই ভিন্ন।

বাণিজ্য যুদ্ধের বর্তমান চিত্র
কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করা চীনা পণ্যের ওপর গড় শুল্ক হার দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং চীনে প্রবেশ করা মার্কিন পণ্যের ওপর গড় শুল্ক ৩১ শতাংশ। তবে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে এই শুল্কের হার অত্যন্ত চড়া। উদাহরণস্বরূপ, চীনে তৈরি তামার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর শুল্ক হার ৭৩ দশমিক ৬ শতাংশ, অ্যালুমিনিয়ামে ৬৫ দশমিক ২ শতাংশ, লোহা ও স্টিলে ৫০ থেকে ৫৮ শতাংশ এবং গাড়ি ও অটো পার্টসে ৪৪ দশমিক ৪ শতাংশ। অন্যদিকে চীনও মার্কিন অপরিশোধিত তেলের ওপর ২০ শতাংশ, তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসে (এলএনজি) ২৫ শতাংশ, সয়াবিনে ১৩ শতাংশ এবং গরুর মাংসে ৭৭ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত শুল্ক বসিয়েছে।

২০২৫ সালের শুরুতে ফেটিলাইজড ফেন্টানিল চোরাচালান ও অভিবাসন ইস্যুতে ১০ শতাংশ শুল্ক বাড়িয়ে সংঘাতের সূচনা করেছিলেন ট্রাম্প। পাল্টা জবাবে চীন মার্কিন কয়লা, জ্বালানি ও গাড়িতে শুল্ক বসায় এবং সমরাস্ত্র ও ক্লিন এনার্জির জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ পাঁচটি ধাতুর রপ্তানি সীমিত করে। একই বছরের এপ্রিলে পাল্টাপাল্টি শুল্কের হার সর্বোচ্চ ১৪৫ শতাংশ ও ১২৫ শতাংশে পৌঁছায়। পরবর্তী সময়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় আলোচনার পর আগামী ১০ নভেম্বর পর্যন্ত কার্যকর একটি সাময়িক শুল্ক বিরতি বা ট্রুস গঠন করা হয়।

তবে এই শুল্ক বিরতি প্রযুক্তিগত সংঘাত বন্ধ করতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি চীনে তৈরি হিউম্যানয়েড রোবট আমদানি নিষিদ্ধ করেছে, ইরানি জ্বালানি বহনের অভিযোগে চীনা শিপিং সংস্থাকে নিষিদ্ধ করেছে এবং চীনা এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞার হুমকি দিয়েছে। জবাবে বেইজিংও মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে ড্রোন ও এর প্রযুক্তি রপ্তানিতে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে।

শুল্কের গণ্ডি পেরিয়ে প্রযুক্তির লড়াই
এই লড়াই কেবল শুল্ক বা করের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা এখন প্রযুক্তি ও কাঁচামালের যোগানকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের দ্বন্দ্বে মোড় নিয়েছে। সেমিকন্ডাক্টর ও ইলেকট্রনিক্স খাতের জন্য অপরিহার্য রেয়ার আর্থ বা বিরল খনিজ শোধনের প্রায় ৯০ শতাংশ ক্ষমতা বেইজিংয়ের দখলে। চীন এই কাঁচামালের রপ্তানি সীমিত করে পশ্চিমা প্রযুক্তি খাতকে চাপে ফেলার কৌশল নিয়েছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনও চীনের উন্নত সেমিকন্ডাক্টর ও চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির বড় বাজার আটকে রেখে বেইজিংয়ের এআই অগ্রগতি ধীর করে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বৈশ্বিক রপ্তানি চিত্র
মার্কিন সেন্সাস ব্যুরোর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে ৫৮৪ বিলিয়ন ডলারের যে দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্য ছিল, ২০২৫ সালে তা কমে ৪১৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসেও বাণিজ্য ১৪ দশমিক ৫ শতাংশ কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে চীনা পণ্যের আমদানি কমে যাওয়ার কারণেই মূলত দ্বি-পাক্ষিক বাণিজ্যের এই পতন। এর ফলে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একক পণ্য বাণিজ্য ঘাটতি ২০২৪ সালের ২৯৭ বিলিয়ন ডলার থেকে কমে ২০২৫ সালে ২০৩ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

তবে এটি মার্কিন অর্থনীতির জন্য বিশাল কোনো সাফল্য এনে দিতে পারেনি। কারণ যুক্তরাষ্ট্র থেকে কম আমদানি করলেও চীন অন্য বিশ্ববাজারে নিজেদের রপ্তানি কয়েক গুণ বাড়িয়ে নিয়েছে। চীনা জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০২৫ সালে বেইজিংয়ের মোট বৈশ্বিক পণ্য রপ্তানি ৬ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ৩ দশমিক ৭৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, যেখানে চীনের বৈশ্বিক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দাঁড়ায় ১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলারের রেকর্ড অঙ্কে।

ট্রাম্পের শুল্ক নীতির সুযোগ নিয়ে চীন আসিয়ান (দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশসমূহ) ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলোতে নিজেদের ইলেকট্রিক গাড়ি, ব্যাটারি, যন্ত্রপাতি ও উচ্চপ্রযুক্তির পণ্য রপ্তানি বাড়িয়েছে। ২০২৫ সালে আসিয়ান দেশগুলোতে চীনের রপ্তানি ১৪ শতাংশ বেড়ে ৬৬০ বিলিয়ন ডলার এবং ইইউতে ৯ শতাংশ বেড়ে ৫৬০ বিলিয়ন ডলার হয়। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসেই চীন ইতিমধ্যে প্রায় ৮২০ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে, যা পুরো ২০২৫ সালের প্রায় কাছাকাছি।

যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক বাণিজ্য ঘাটতি কি কমেছে?
ট্রাম্পের শুল্ক কাঠামোর প্রধান লক্ষ্যই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনা। তবে সরকারি তথ্য বলছে, মার্কিন মোট বাণিজ্য ঘাটতি কমার বদলে বরং কিছুটা বেড়েছে। ট্রাম্প দায়িত্ব নেওয়ার আগে ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পণ্য ও সেবার বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ১ দশমিক ২০১ ট্রিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে তার মেয়াদের প্রথম বছরেই এই ঘাটতি ২ দশমিক ৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ১ দশমিক ২৩৫ ট্রিলিয়ন ডলারে।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র বেইজিংয়ের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক ঘাটতি কমাতে পারলেও, মার্কিন ব্যবসায়ীরা অন্য দেশ থেকে বিকল্প হিসেবে বেশি দামে পণ্য আমদানি করায় সামগ্রিক মার্কিন বাণিজ্য ঘাটতি আরও বেড়েছে। ফলে ট্রাম্পের শুল্ক নীতি যুক্তরাষ্ট্রকে সামগ্রিক বাণিজ্যিক সুফল দিতে ব্যর্থ হলেও, চীন তার রপ্তানির বাজার পুনর্বিন্যাস করে বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। এই জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সংকটের সমাধানই এখন শি-ট্রাম্প শীর্ষ বৈঠকের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

আল জাজিরার বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম