আল-আজরাক বিমানঘাঁটি কেন বারবার ইরানের হামলা, জর্ডানে মোতায়েন ৪ হাজার মার্কিন সেনা

জর্ডানের আকাশে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করছে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
জর্ডানের আকাশে ইরান থেকে ছোড়া ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করছে দেশটির প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা | ছবি: আল জাজিরা
0

হরমুজ প্রণালিতে জ্বালানি তেলবাহী ট্যাংকারে পারস্পরিক হামলার জেরে জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান। ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) দাবি, মার্কিন যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও মোতায়েন কেন্দ্র লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০টি ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি আকাশেই ধ্বংস করা হয়েছে।

জর্ডানে কী ঘটলো

গত মঙ্গলবার রাতে ও বুধবার সকালে জর্ডানের জারকা প্রদেশের আল-আজরাক এলাকায় অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ে আইআরজিসি। ইরানের আধা-সরকারি সংবাদমাধ্যম তাসনিমের বরাতে আইআরজিসি দাবি করেছে, এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-১৫ যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ ও আশ্রয়কেন্দ্রে হামলা চালিয়ে ‘ভারী ক্ষতি’ করা হয়েছে।

তবে জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, ২০টি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মধ্যে ১৮টি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় আটকানো হয়েছে এবং বাকি দুটি জনশূন্য এলাকায় পড়েছে। কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মার্কিন কর্মকর্তা কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে বলেন, ‘জর্ডানে মার্কিন বাহিনীর ওপর ইরানের হামলা কোনো ক্ষয়ক্ষতি করতে পারেনি। সমন্বিত বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কাছে ইরানের এই জবাব অকার্যকর ছিল।’

আল-আজরাক ঘাঁটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

আম্মান থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে জর্ডানের পূর্ব মরুভূমিতে অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি। ১৯৬৬ সালে ইসরাইলের সঙ্গে যুদ্ধে নিহত জর্ডানি যুদ্ধবিমান চালক লেফটেন্যান্ট মুওয়াফফাক সালতির নামানুসারে ঘাঁটির নামকরণ করা হয়েছে। দুটি রানওয়েবিশিষ্ট এই বিশাল ঘাঁটিটি মার্কিন বাহিনীর জন্য অত্যন্ত কৌশলগত।

২০২১ সালে আম্মান ও ওয়াশিংটন একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার মাধ্যমে জর্ডানের ১২টি সামরিক স্থাপনায় মার্কিন বাহিনীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত হয়। ২০২৬ সালের মার্কিন কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জর্ডানে প্রায় ৪ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছেন। এদের একটি অংশ আল-আজরাক ঘাঁটিতে অবস্থান করছেন। এছাড়া দক্ষিণ জর্ডানের কিং ফয়সাল বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়া-ইরাক সীমান্তের কাছে টাওয়ার ২২ নামের একটি সামরিক লজিস্টিক ঘাঁটিতেও মার্কিন সেনা রয়েছে।

লন্ডনের কিংস কলেজের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক তাহানি মুস্তাফা আল জাজিরাকে বলেন, ‘আল-আজরাক ঘাঁটি সেই কয়েকটি ঘাঁটির একটি, যেখানে এফ-৩৫, এফ-১৬ ও এফ-২২ যুদ্ধবিমান মোতায়েন থাকে। এখানে এমন হ্যাঙ্গার আছে যেখানে আমেরিকানরা তাদের সামরিক সম্পদ লুকিয়ে রাখতে পারে এবং ইরান মূলত সেগুলোকেই লক্ষ্যবস্তু করছে।’

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউটের গবেষক ডেভিড শেঙ্কার অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, জর্ডান মার্কিন বাহিনীকে ‘কৌশলগত গভীরতা’ দেয়। উপসাগরীয় দেশগুলোর তুলনায় ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের পাল্লার বাইরে থাকায় জর্ডানের অবস্থান ওয়াশিংটনের জন্য ‘অপরিহার্য’।

ইরান কেন জর্ডানকে লক্ষ্যবস্তু করছে

দুই সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালির লারাক দ্বীপে ইরানের রকেট লঞ্চারে মার্কিন হামলার মধ্য দিয়ে সাম্প্রতিক উত্তেজনার সূত্রপাত। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান ওই লঞ্চার ব্যবহার করে প্রণালিতে সমুদ্র মাইন ছড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছিল। এর জবাবে ইরান প্রথমে উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালায় এবং পরে তা জর্ডান পর্যন্ত সম্প্রসারিত করে।

চলতি যুদ্ধে মার্চ থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে আল-আজরাক ঘাঁটিতে ১০টির বেশি হামলার দাবি করেছে তেহরান। গত ১৭ জুলাইয়ের হামলায় দুই মার্কিন সেনা নিহত, একজন নিখোঁজ ও চারজন আহত হওয়ার কথা নিশ্চিত করেছিল মার্কিন সেন্টকম। গত জুলাইয়ে দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের শুরুর দিকে বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও কাতার থেকে বেশ কিছু মার্কিন সেনা জর্ডানে সরিয়ে নেয়া হয়েছে। ২০১৭ সালে মার্কিন কংগ্রেস এই ঘাঁটি সম্প্রসারণের জন্য ১৪ কোটি ৩০ লাখ ডলার বরাদ্দ অনুমোদন করেছিল।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে অবলম্বনে

এএম