বেনজীরকে দেশে ফেরাতে ‘ব্যর্থতা’ নিয়ে সংসদে আলোচনা

জাতীয় সংসদের অধিবেশন, বেনজীর আহমেদ
জাতীয় সংসদের অধিবেশন, বেনজীর আহমেদ | ছবি: এখন টিভি
0

বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দুবাই থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যর্থতাকে ‘প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার গুরুতর ‘ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করে এ পর্যন্ত নেয়া পদক্ষেপের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংসদে উপস্থাপনের দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় ৬টি দেশের পাসপোর্ট পাওয়ার অভিযোগের তদন্তের অগ্রগতি এবং দেশে-বিদেশে তার অবৈধ সম্পদ জব্দে নেয়া পদক্ষেপের বিস্তারিত প্রতিবেদন চাওয়া হয়েছে।

আজ (মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে কার্যপ্রণালি-বিধির ১৪৭ বিধিতে ঢাকা-১৪ আসনের সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম এ সাধারণ প্রস্তাব উত্থাপন করেন।

প্রস্তাবে বলা হয়, মানবতাবিরোধী অপরাধ, গুম, অর্থপাচার ও দুর্নীতির একাধিক মামলায় অভিযুক্ত বেনজীর আহমেদ ইন্টারপোলের রেড নোটিশে দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়ার পর গত ১৪ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সংসদে তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। পরে তার জামিনে মুক্তি এবং সেন্ট লুসিয়ায় যাওয়ার ঘটনা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় গুরুতর ব্যর্থতার পরিচায়ক।

প্রস্তাবে ৩০ দিনের মধ্যে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠানোসহ এ পর্যন্ত নেয়া সব পদক্ষেপের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ সংসদে দেয়ার দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি প্রত্যর্পণের নথিতে কোনো আইনি বা পদ্ধতিগত ত্রুটি ছিল কি না এবং এ ব্যর্থতার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করারও দাবি জানানো হয়েছে।

মীর আহমাদ বিন কাসেম বলেন, ভুক্তভোগীরা অনেক প্রতিশ্রুতি ও বিবৃতি শুনেছেন। কিন্তু সরকার বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সত্যিকার অর্থে চেষ্টা করছে—এমন অনুভূতি তাদের মধ্যে তৈরি হয়নি।

তিনি বলেন, বেনজীর গ্রেপ্তারের খবর পাওয়ার পর স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা দুবাই গিয়ে দেশটির শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করলে এবং বাংলাদেশের পক্ষ থেকে শক্তিশালী আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক মানের ল ফার্ম নিয়োগ করে আইনি প্রক্রিয়ায় কোনো ফাঁক না রাখার উদ্যোগ নেয়া হলে সরকারের আন্তরিকতার প্রমাণ মিলত।

প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে চিঠি দিয়ে বেনজীরকে ফেরত দেয়ার আবেদন করতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে প্রত্যর্পণ চুক্তির সীমাবদ্ধতা থাকলে দ্রুত নতুন চুক্তি বা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগেরও আহ্বান জানান।

মীর আহমাদ বলেন, আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক—সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মাধ্যমে বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া উচিত ছিল। সরকার সব চেষ্টা করেও ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল মন্ত্রীর সংসদে এসে ব্যর্থতার দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করা উচিত ছিল।

আলোচনায় নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান বলেন, বেনজীরের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দৃষ্টান্তমূলক বিচার হওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ভারতের সঙ্গে থাকা বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির কার্যকারিতা বাড়িয়ে বিদেশে অবস্থানরত অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ১৪ জুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলায় সংসদ সদস্যরা তাকে ধন্যবাদ জানিয়েছিলেন। কিন্তু পরে তিনি কীভাবে জামিন নিয়ে অন্য দেশে চলে গেলেন, সেটি বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বেনজীরকে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ কতটা সুচারুভাবে নেয়া হয়েছে, তা সংসদে স্পষ্ট করার দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের শীর্ষ পর্যায়ের অভিযুক্তদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের পদক্ষেপ এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য মার্জিয়া বেগম বলেন, বেনজীরের জামিন নিয়ে দেশত্যাগের ঘটনায় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা স্পষ্ট হয়েছে। তাকে দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে দেশ-বিদেশে থাকা অবৈধ সম্পদ জব্দ এবং গুম-হত্যাসহ অভিযোগগুলোর বিচার নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।

জাগপা সভাপতি ও সংরক্ষিত সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার তাসমিয়া প্রধান বলেন, ২০২৫ সালে ইন্টারপোলের মাধ্যমে বেনজীরের বিরুদ্ধে রেড অ্যালার্ট জারি এবং পরে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বিষয়টি জানানো হয়েছিল। তাকে গ্রেপ্তারের পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রত্যর্পণ প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা দাবি করেন তিনি।

তিনি বলেন, বেনজীরকে দেশে এনে বিচারের আওতায় আনার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়েছে কি না, সেটি জাতি জানতে চায়।

আলোচনায় আরও বলা হয়, শুধু বেনজীরকে বিচারের আওতায় আনাই যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাতে গুম, হত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়াতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

এসএস