আইপ্যাডের তুলনায় আইফোনের দাম কেন বেশি?

আইফোন ও আইপ্যাডের যন্ত্রাংশ
আইফোন ও আইপ্যাডের যন্ত্রাংশ | ছবি: এআই জেনারেটেড
0

আইপ্যাড ও আইফোন দুটিই অ্যাপলের অন্যতম দুটি পণ্য। পণ্যের সঙ্গে এগুলোর দামেও পার্থক্য রয়েছে। তবে আকারে বড় আইপ্যাডের তুলনা ছোট আইফোনের দাম অনেকটাই বেশি!  সাধারণ চিন্তায় মনে হতে পারে—আকারের পার্থক্যের কারণে একটি আইপ্যাডের দাম আইফোনের চেয়ে বেশি হওয়া উচিত। সম্প্রতি ইয়াহু টেক প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।

টিভি, ল্যাপটপ কিংবা স্মার্টওয়াচের মতো অন্যান্য ডিভাইসের ক্ষেত্রেও বিষয়টি এমন; বড় মডেলগুলোর গায়েই সাঁটানো থাকে চড়া মূল্যের ট্যাগ। অথচ বর্তমানে অ্যাপলের সবচেয়ে সাশ্রয়ী আইফোন (আইফোন ১৭ই)-এর দাম যেখানে ৫৯৯ ডলার, সেখানে তাদের সবচেয়ে সুলভ আইপ্যাড (১১তম জেনারেশন)-এর দাম বেশ মাত্র ৪৪৪ ডলার।

প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, এর নেপথ্যে রয়েছে ডিজাইন, ভেতরের হার্ডওয়্যার, বাজারে পণ্যটির চাহিদা এবং এর সুনির্দিষ্ট ক্রেতাগোষ্ঠীর একটি সংমিশ্রণ।

৫৫ ইঞ্চি টিভির সঙ্গে ৬৫ ইঞ্চি টিভির যে তুলনা, আইপ্যাডের সঙ্গে আইফোনের বিষয়টি ঠিক তেমন নয়; আইপ্যাড কেবল বড় আকারের কোনো আইফোন নয়। এমনকি আপনি কোন মডেল বিবেচনা করছেন, তার ওপর ভিত্তি করে কিছু আইপ্যাডের দাম যেকোনো আইফোনের চেয়েও বেশি হতে পারে।

ছোট আকৃতির যন্ত্রাংশ ডিজাইনে জটিলতা

আইফোনের তুলনামূলক ছোট আকারের ডিজাইনিং প্রধান চ্যালেঞ্জ। মাদারবোর্ড, ব্যাটারি, সিস্টেম অন চিপ, রেডিও অ্যান্টেনা, সেন্সর ও স্পিকারের মতো মৌলিক প্রতিটি যন্ত্রাংশ খুব ক্ষুদ্র একটি জায়গায় মেলাতে হয়। ভারী বা মোটা না বানিয়ে এসব যন্ত্রাংশ আইফোনের ভেতরে নিখুঁতভাবে বসাতে প্রকৌশলীদের প্রচুর গবেষণা ও কাজ করতে হয়। 

একটি যন্ত্রাংশ যেন অন্যটির কাজ ব্যাহত না করে এবং ভেতরের তাপ যেন দ্রুত বেরিয়ে যেতে পারে—সেভাবেই পুরো লেআউট সাজাতে হয়। এর ওপর পুরো ডিভাইস সচল রাখার মতো ব্যাটারি পাওয়ারের বিষয় তো আছেই।

অন্যদিকে, একটি আইপ্যাডে কাজ করার জন্য প্রকৌশলীরা অনেক বেশি জায়গা পান, যা এর উৎপাদন খরচ কমিয়ে আনে। অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশ সাজাতে ডিজাইনারদের খুব বেশি কড়াকড়ি নিয়ম মানতে হয় না এবং বড় পরিসর থাকার কারণে তাপ নির্গমন প্রক্রিয়াও অনেক সহজ হয়। এর অর্থ এই নয় যে আইপ্যাডের ভেতরের অংশ যেমন-ইচ্ছে সাজানো হয়; তবে আইফোনের মতো এতে অতটা নিবিড় গবেষণার প্রয়োজন পড়ে না।

আইফোনে প্রিমিয়াম হার্ডওয়্যারের ব্যবহার

আকারের পার্থক্য ছাড়াও আইফোন ও আইপ্যাডের মূল তফাৎ হলো এর ভেতরের প্রযুক্তি। প্রতিটি আইফোনে এমন অনেক উপাদান থাকে যা অধিকাংশ আইপ্যাড মডেলে অনুপস্থিত। যেমন—ফোন কলের জন্য প্রয়োজনীয় রেডিও ও অ্যান্টেনা নেটওয়ার্ক। ওয়াই-ফাই কলিং বা আইফোনের সংযোগ ব্যবহার করে আইপ্যাডে কল করা গেলেও, সেলুলার আইপ্যাডগুলো মূলত কেবল ডেটা-ব্যবহারের জন্য তৈরি; সরাসরি প্রথাগত ফোন কল এতে করা যায় না।

ক্যামেরার দিক থেকেও আইপ্যাডের চেয়ে অনেক এগিয়ে আইফোন। এমনকি আইপ্যাড প্রো-এর চেয়েও আইফোন ১৭-এর ক্যামেরা ঢের ভালো। যেখানে নতুন এম৫ আইপ্যাড প্রো-তে রয়েছে ১২ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা, সেখানে আইফোন ১৭-এর পেছনের দুটি ক্যামেরাই ৪৮ মেগাপিক্সেলের। 

আইপ্যাডের ক্যামেরায় অপটিক্যাল জুম নেই, অন্ধকারে এর পারফরম্যান্স দুর্বল এবং এতে সিনেম্যাটিক ভিডিও মোডের মতো সুবিধাগুলোও অনুপস্থিত। আইপ্যাডের ক্যামেরা জরুরি প্রয়োজনে কিংবা ডকুমেন্ট স্ক্যান করার জন্য কার্যকর হলেও দৈনন্দিন ছবি তোলার উদ্দেশ্যে এটি তৈরি হয়নি।

আইফোন ও আইপ্যাডের দামের পার্থক্যের কারণ |ছবি: এআই জেনারেটেড

এছাড়া আইফোন ১৭ সিরিজের প্রতিটি মডেলে রয়েছে ওএলইডি স্ক্রিন, যা প্রো লাইন ছাড়া অন্য সব আইপ্যাডের এলসিডি স্ক্রিনের তুলনায় বেশ ব্যয়বহুল। প্রতিটি আইফোন ১৭ মডেলে ১২০ হার্টজ রিফ্রেশ রেটের ‘প্রোমোরশন’ ডিসপ্লে থাকলেও, প্রো আইপ্যাড ছাড়া বাকি সবগুলোতে রয়েছে সাধারণ ৬০ হার্টজের স্ক্রিন। এমনকি কম দামি আইপ্যাডগুলোতে অপেক্ষাকৃত পুরোনো চিপসেট ব্যবহার করা হয়। যেমন—২০২৫ সালে বাজারে আসা ১১তম জেনারেশনের আইপ্যাডে ব্যবহৃত হয়েছে এ১৬ চিপ, যা প্রথম দেখা গিয়েছিল ২০২২ সালের আইফোন ১৪ প্রো-তে। পাশাপাশি আইপ্যাডে ম্যাগসেফ চার্জিং, এনএফসি এবং আইপি ওয়াটার-রেজিস্ট্যান্স রেটিংয়ের মতো সুবিধাগুলোও থাকে না।

প্রতিযোগিতার ভিন্ন ক্ষেত্র ও বাজার

আইফোন ও আইপ্যাড একই ধরনের অপারেটিং সিস্টেমে চললেও এবং একই অ্যাপস সাপোর্ট করলেও, দুটি কিন্তু এক বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না। বর্তমান যুগে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ স্মার্টফোন। কল বা মেসেজিং, গান শোনা, জিপিএস নেভিগেশন, বিনোদন কিংবা ছবি তোলা—সব কাজেই ফোন প্রয়োজন।

কিন্তু আইপ্যাড মোটেও ততোটা জরুরি কোনো ডিভাইস নয়। অনেকের কাছেই ট্যাবলেট মানে স্ট্রিম করা, বই পড়া বা নোট নেওয়ার জন্য একটি গৌণ বা দ্বিতীয় ডিভাইস। শিক্ষার্থী বা ক্রিয়েটিভ পেশাজীবীদের জন্য এটি দুর্দান্ত হতে পারে, তবে ফোনের মতো এটি অবশ্য প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠেনি। একই কাজের জন্য ক্রেতারা বড় স্ক্রিনের ‘ফ্যাবলেট’ ফোন, ক্রোমবুক কিংবা বাজেট ফ্রেন্ডলি ম্যাকবুক নেওয়ার কথা ভাবতে পারেন।

এ কারণেই সামনে অ্যাপলের কম দামী আইপ্যাড বিক্রির ভালো যুক্তি রয়েছে। শুরুর দামই বেশি হলে খুব কম মানুষই ট্যাবলেট কিনবে। এতে আইক্লাউড বা অ্যাপল মিউজিকের মতো সেবাগুলোতে নতুন ক্রেতা যুক্ত করার সুযোগ হারাবে অ্যাপল। 

তাছাড়া শিক্ষা খাতে আইপ্যাডকে ক্রোমবুকের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, যেখানে অ্যাপল চায় স্কুলগুলো তাদের ডিভাইস কিনুক এবং শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে পরিবারগুলোর কাছে অ্যাপল ইকোসিস্টেম পৌঁছে যাক।

অন্যদিকে, অ্যাপলের উপার্জনের সবচেয়ে বড় উৎস হলো আইফোন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই ডিভাইসের পেছনে সবচেয়ে বেশি সময় ও অর্থ ব্যয় করা কোম্পানির জন্য লাভজনক। 

অ্যাপল শুরু থেকেই আইফোনকে একটি প্রিমিয়াম ফোন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং ক্রেতারা যে এর জন্য চড়া মূল্য দিতে প্রস্তুত, তা তারা ভালো করেই জানে। খুব বেশি সস্তা আইফোন বাজারজাত করলে বছরের পর বছর ধরে গড়ে তোলা অ্যাপলের এ প্রিমিয়াম ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হতে পারে; তাই তাদের সবচেয়ে 'সাশ্রয়ী' আইফোন ১৭ই-এর দামও বাজেট অ্যান্ড্রয়েড ফোনগুলোর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বলে মনে করছেন প্রযুক্তিবিদরা।

কেনাকাটার পদ্ধতির ক্ষেত্রেও তফাৎ রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে সিংহভাগ ক্রেতাই মোবাইল ক্যারিয়ারের মাধ্যমে আইফোন কেনেন। সেখানে বেশ কয়েক বছরের দামি প্ল্যান নেওয়ার চুক্তিতে ‘ফ্রি’ ফোন বা কিস্তিতে ছাড় পাওয়া যায়, যা ফোনের মূল আসল দামটি আড়াল করে রাখে। এছাড়া মানুষ ফোনের চেয়ে ট্যাবলেট অনেক দেরিতে বা কম কম আপগ্রেড করে থাকে।

আইপ্যাডের দাম বৃদ্ধির সম্ভাবনা

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বেস মডেলের আইপ্যাডের সঙ্গে আইফোনের তুলনা করা হলেও, অন্যান্য আইপ্যাড মডেলগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে—আইফোন সব সময় বেশি দামি নয়। বেস আইপ্যাডের ১২৮ জিবি মডেলের দাম শুরু হয় ৪৪৪ ডলার থেকে, যা ৫১২ জিবির জন্য ৭৪৯ ডলার পর্যন্ত যায়। 

সেলুলার কানেক্টিভিটির জন্য বাড়তি দিতে হয় আরও ১৫০ ডলার। এর মানে ২৫৬ জিবি সেলুলার আইপ্যাডের দাম পড়ে ৭০০ ডলার। এটি আইফোন ১৭ই-এর চেয়ে ১০০ ডলার বেশি; অথচ এতে রয়েছে তুলনামূলক দুর্বল স্ক্রিন ও ক্যামেরা এবং সরাসরি কল করার সুবিধাও নেই।

আইপ্যাডের অন্যান্য মডেলগুলোর দাম আইফোনের চেয়ে অনেক বেশি, কারণ সেগুলোতে রয়েছে শক্তিশালী স্পেসিফিকেশন। এম৪ আইপ্যাড এয়ার-এর ১২৮ জিবি মডেলের দাম শুরু হয় ৭৪৯ ডলার থেকে। অন্যদিকে ছোট আকারের কারণে প্রকৌশলগত জটিলতায় থাকা আইপ্যাড মিনি-এর ১২৮ জিবি মডেলের দাম শুরু ৬০০ ডলার থেকে।

সবচেয়ে বড় চমক হলো আইপ্যাড প্রো, যা নিজস্ব প্রসেসর ও ওএলইডি স্ক্রিনের শক্তিতে যেকোনো আইফোনের দামকে অনায়াসে ছাড়িয়ে যায়। যেমন—সর্বোচ্চ স্পেসিফিকেশনের ২ টিবি আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্স-এর দাম যেখানে ২,০০০ ডলার, সেখানে ২ টিবি স্টোরেজসহ ১৩ ইঞ্চির এম৫ আইপ্যাড প্রো-এর দাম ২,৬০০ ডলার। আর এতে ন্যানো-টেক্সচার গ্লাস নিলে আরও ১০০ ডলার এবং সেলুলার সুবিধা যুক্ত করলে আরও ২০০ ডলার যোগ হয়। এ মডেলগুলো সাধারণ ফোনের ব্যবহারের চেয়ে ল্যাপটপ বা ডেস্কটপের বিকল্প হিসেবে প্রফেশনাল কাজের জন্য তৈরি।

এএইচ