প্রকৃতি যেন আপন আলোয় এঁকে দিয়েছে এই ব-দ্বীপের ললাট। সমুদ্রের জলরাশি থেকে জীববৈচিত্র্যে ভরপুর ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। মেঘ-পাহাড়ের যৌথতা, ঝর্ণাধারার মাঝেই এই বাংলার সৌন্দর্যের আধার। জল, জঙ্গল, পাহাড়ের সৌন্দর্যের মাঝেই বিস্তৃত দেশের পর্যটন খাত।
ঠিক তেমনি নিজস্ব সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আর বৈচিত্র্যময় খাবারের সম্ভারে বিশ্বের কাছে নিজেদের পরিচিত করেছে চীনারা।
দেশটিতে আছে দ্য গ্রেট ওয়াল মহাপ্রাচীর, সামার প্যালেস, লি নদী, রেইনবো মাউন্টেনের মতো অর্ধশত ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন; যা পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর এই দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের পরিধি এখন বিস্তৃত হচ্ছে পর্যটন খাতেও। বেড়েছে বেইজিং, সাংহাই, গুয়াংজু, শেনঝেনসহ বিভিন্ন শহরে বাংলাদেশি পর্যটন ও ব্যবসায়িক ভ্রমণের আগ্রহ। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে চীনা পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারলে সুগম হবে বৈদেশিক মুদ্রার পথ।
আরও পড়ুন:
পর্যটন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনা পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশকে পরিচিত করতে প্রয়োজন যথাযথ প্রচারণা ও ফ্লাইট যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ করা। পাশাপাশি অর্থনৈতিক ভিত শক্ত করতে অবকাঠামো, হোটেল, পরিবহন ও বিনোদনে নতুন বিনিয়োগের পরামর্শ তাদের।
পর্যটন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদ উল আলম বলেন, ‘ম্যাক্সিমাম দেশে কিন্তু চাইনিজ ট্যুরিস্টরা কিন্তু ডমিনেট করে বৈদেশিক ট্যুরিস্ট অ্যারাইভালের ক্ষেত্রে। এটা কিন্তু আমাদের দেশেও হতে পারে। আমরা প্রচুর পরিমাণে ট্যুরিস্ট পেতে পারি আমাদের এইখানে। এই ধরনের কাজ করার জন্য যে ধরনের উদ্যোগ নেয়া দরকার, পজিটিভ যে ইনিশিয়েটিভ নেয়া দরকার, সেইগুলা আমরা নিচ্ছি না। দুই দেশের জনগণকে কাছে আনার জন্য যেসব ভূমিকা রাখা দরকার, সেইগুলা করতে হবে। এবং এইগুলা কিন্তু উদ্যোগটা সরকারিভাবেই নিতে হবে।’
বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগের অন্যতম শীর্ষ দেশ চীন। অথচ দারুণ অগ্রগতি থাকা সত্ত্বেও অনেকটা আড়ালেই রয়ে গেছে দু’দেশের পর্যটন ব্যবস্থা।
বাংলাদেশে অসংখ্য চীনা নাগরিক থাকলেও নানা অসংগতির কারণে এখানকার পর্যটন কেন্দ্রগুলো তাদের আকর্ষণ করতে পারছে না। ঠিক তেমনি চীনের অনেক পর্যটন কেন্দ্র বাংলাদেশিদের জন্য অধরাই রয়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, দু’দেশের পর্যটন ব্যবস্থাপনাকে ঢেলে সাজানো এখন জরুরি।
আরও পড়ুন:
চায়না চেম্বার অব কমার্স বলছে, দুই দেশের পর্যটন তৈরি করতে পারে নতুন অর্থনৈতিক সেতু বন্ধন। আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের পর্যটন কেন্দ্রগুলো হয়ে উঠতে পারে বৈদেশিক মুদ্রা আয় ও কর্মসংস্থানের নতুন উৎস।
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘পর্যটনের জন্য সর্বপ্রথম পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন লাগবে, দ্বিতীয়ত সিকিউরিটি লাগবে—ওই এলাকায় নিরাপত্তা। তৃতীয়ত ওইখানে আপনার রেস্ট হাউস বা হোটেল, মোটেল, খাবারের জন্য, থাকার জন্য আয়োজন থাকতে হবে। চায়নার যারা পর্যটনের কাজ ওই দেশে করেছে, চীন দেশে; তাদের সঙ্গে জয়েন্ট ভেঞ্চার করতে পারেন, যে তোমার টেকনোলজি তুমি নিয়ে আসো, আইসা আমার পতেঙ্গাকে সাজাও। এখানে যা লাভ হবে ফিফটি-ফিফটি।’
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন বলছে, এই খাতের সম্ভাবনাকে বাস্তবায়ন করতে অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে চীনা পর্যটকদের উপযোগী সেবা নিশ্চিতের কাজ করছেন তারা। এছাড়া প্রচারসহ পর্যটকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতিও তাদের।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক (পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণ) জিয়াউল হক হাওলাদার বলেন, ‘সার্ভিস কোয়ালিটির ইমপ্রুভ করতে হবে। আমাদের ফুডে ভ্যারিয়েশন আনতে হবে, আমাদের ফুড ফিউশনে গুরুত্ব দিতে হবে, আমাদের কন্টিনেন্টাল ফুডের পাশাপাশি ট্র্যাডিশনাল যে ফুডগুলো আছে সেগুলো তৈরি করতে হবে। তাদের তো ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্টের যে পরিমাণ নলেজ, তারা যদি আমাদের এখানে নিয়ে আসে, আমাদের ট্রেইন আপ করে, আমাদের অনেক ব্যাক্যান্ট ল্যান্ড আছে। বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের প্রচুর জমি আছে ব্যাক্যান্ট ল্যান্ড। সেগুলোতে যদি চিনের ইনভেস্টমেন্ট আসে, তাহলে চীনা ট্যুরিস্টরা কিন্তু আসবে।’
বিনিয়োগ ও সংযোগ বাড়াতে দু’দেশের সরকার এরই মধ্যে একাধিক সমঝোতা ও সহযোগিতার উদ্যোগ নিয়েছে। আর এর মাধ্যমেই প্রকৃতি, অ্যাডভেঞ্চার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ধারণ করে পর্যটন খাতে লেখা হবে নতুন গল্প; যা দু’দেশের অর্থনীতিকে করবে আরও গতিশীল।





