নিচে স্বাধীন বাংলাদেশের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারা প্রতিটি রাষ্ট্রপতির বিস্তারিত তথ্য ও ঘটনাপ্রবাহ ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো:
আরও পড়ুন:
শেখ মুজিবুর রহমান: প্রথম রাষ্ট্রপতি থেকে আবার রাষ্ট্রপতি (Sheikh Mujibur Rahman)
প্রথম দায়িত্বকাল (প্রবাসী সরকার): ১৯৭১ সালের ১০ই এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকার গঠন করে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রথম রাষ্ট্রপতি করা হয়। তিনি পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির (Acting President) দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ নজরুল ইসলাম। ১৯৭২ সালের ১০ই জানুয়ারি মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে ১২ই জানুয়ারি তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলে এই মেয়াদের ইতি ঘটে।
দ্বিতীয় দায়িত্বকাল (একদলীয় বাকশাল): পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে একদলীয় শাসনব্যবস্থা (BAKSAL) এবং রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা হলে তিনি পুনরায় রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। তবে বাকশাল প্রবর্তনের মাত্র সাত মাসের মাথায়, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট এক মর্মান্তিক সামরিক অভ্যুত্থানে সপরিবারে নিহত হন তিনি। ফলে তার সাংবিধানিক মেয়াদ অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
আবু সাঈদ চৌধুরী: স্বেচ্ছায় পদত্যাগ (Abu Sayeed Chowdhury)
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর লন্ডনে কূটনীতিক মিশন শেষ করে ফিরে এসে ১৯৭২ সালের ১২ই জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন সাবেক প্রধান বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সাথে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিয়ে তার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হতে থাকে। তিনি মনে করতেন তাকে অলংকারিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে রাখা হয়েছে এবং তিনি দেশের নীতিগত কাজে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না। একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যে তৈরি হওয়া মানসিক দূরত্বের কারণে মেয়াদের চার বছর বাকি থাকতেই ১৯৭৩ সালের ২৪শে ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করেন।
আরও পড়ুন:
মুহম্মদুল্লাহ: দায়িত্বে এক বছর (Mohammad Mohammadullah)
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার মুহম্মদুল্লাহকে ১৯৭৪ সালের ২৭শে জানুয়ারি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন করা হয়। কিন্তু সরকার পরিচালনায় তার অবস্থান ও ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত বলে গণমাধ্যমে উঠে আসে। পরবর্তীতে ১৯৭৫ সালের ২৫শে জানুয়ারি সংবিধানে চতুর্থ সংশোধনী পাশ করে সরকার কাঠামো পরিবর্তন এবং বাকশাল ব্যবস্থা কায়েম করার মধ্য দিয়েই মাত্র এক বছরের মাথায় তার রাষ্ট্রপতির দায়িত্বের অবসান ঘটে।
খন্দকার মোশতাক আহমেদ: ৮১ দিনের রাষ্ট্রপতি (Khondaker Mostaq Ahmad)
১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর সেনাবাহিনীর একটি অংশের সমর্থনে খন্দকার মোশতাক আহমদ বেআইনিভাবে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পরবর্তীতে বাণিজ্যমন্ত্রী ছিলেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র ৮১ দিনের মাথায় ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বর মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের মুখেই ৫ই নভেম্বর তাকে পদচ্যুত হতে হয়।
বিচারপতি আবু সায়েম: সামরিক শাসনের চাপে বিদায় (Abu Sadat Mohammad Sayem)
খন্দকার মোশতাক ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ১৯৭৫ সালের ৬ই নভেম্বর বাংলাদেশের প্রথম প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে তিনি জাতীয় সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দিয়ে সারা দেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং নিজে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক (CMLA) হন। তবে প্রকৃত ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক ছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান। একপর্যায়ে জিয়াউর রহমানের প্রবল চাপে পড়ে ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল ‘ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যগত কারণ’ দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে তার রচিত 'অ্যাট বঙ্গভবন: লাস্ট ফেইজ' গ্রন্থে তিনি বিস্তারিত তুলে ধরেন কীভাবে সামরিক চাপের মুখে তাড়াহুড়ো করে তাকে পদ ছাড়তে হয়েছিল।
আরও পড়ুন:
জিয়াউর রহমান: হত্যাকাণ্ডের শিকার রাষ্ট্রপতি (Ziaur Rahman)
প্রথম ও দ্বিতীয় পর্ব: ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি সায়েমের পদত্যাগের পর ১৯৭৭ সালের ২১শে এপ্রিল সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পান। তিনি ১৯৭৮ সালের ১২ই জুন পর্যন্ত ভারপ্রাপ্ত হিসেবে থাকার পর ওই দিন নির্বাচনে জয়ী হয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। সেনাবাহিনীর প্রধান পদ না ছেড়েই তিনি দল গঠন ও নির্বাচন করেছিলেন, যা নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। পরে তিনি ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (BNP) প্রতিষ্ঠা করেন। তবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধানের ৫ বছর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই, ১৯৮১ সালের ৩০শে মে চট্টগ্রামে এক সামরিক ক্যু-তে সেনাসদস্যদের হাতে নির্মমভাবে নিহত হন তিনি।
আবদুস সাত্তার: সামরিক অভ্যুত্থানে অপসারিত (Abdus Sattar)
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার সময় বিচারপতি আবদুস সাত্তার ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি। ৩০শে মে তিনি অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন এবং দায়িত্ব নেওয়ার ৬ মাসের মাথায় ১৯৮১ সালের ১৫ই নভেম্বর অনুষ্ঠিত বিতর্কিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার মাত্র চার মাসের কিছু বেশি সময় পর, ১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ তৎকালীন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের (Military Coup) মাধ্যমে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান সাত্তারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করেন।
আবুল ফজল মোহাম্মদ আহসান উদ্দীন চৌধুরী: সামরিক শাসনের ছায়ায় রাষ্ট্রপতি (A. F. M. Ahsanuddin Chowdhury)
১৯৮২ সালের ২৪শে মার্চ ক্ষমতা দখলের পর সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদ নিজেকে সিএমএলএ ঘোষণা করেন এবং ৩ দিন পর ২৭শে মার্চ পুতুল রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিচারপতি আহসান উদ্দীন চৌধুরীকে বঙ্গভবনে বসান। কিন্তু ঘোষিত সামরিক আইন অনুযায়ী প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের অনুমোদন ছাড়া রাষ্ট্রপতির কোনো স্বাধীন ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ ছিল না। প্রায় ২০ মাস নামে মাত্র ক্ষমতায় রাখার পর, ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর জেনারেল এরশাদ তাঁকে সরাসরি পদচ্যুত করে নিজেই রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
আরও পড়ুন:
এইচ এম এরশাদ: গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত (Hussain Muhammad Ershad)
সামরিক শাসন জারির দুই বছর ১০ মাস পর ১৯৮৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর সামরিক প্রধান থেকে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতির পদে বসেন এইচ এম এরশাদ। পরবর্তীতে ১৯৮৬ সালের ২৩শে অক্টোবর তীব্র বিতর্কের মুখে আয়োজিত নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে বেসামরিক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে পুনরায় শপথ নেন এবং সামরিক আইন প্রত্যাহার করেন। তবে স্বৈরাচারবিরোধী সর্বদলীয় তীব্র গণ-অভ্যুত্থানের (1990 Mass Uprising) মুখে নির্বাচিত মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার প্রায় এক বছর আগেই ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং যৌথ রাজনৈতিক দলের কাছে নতিস্বীকার করে ক্ষমতা হস্তান্তর করেন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ: দুই মেয়াদের রাষ্ট্রপতি (Shahabuddin Ahmed)
অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রথম মেয়াদ (১৯৯০–১৯৯১): ১৯৯০ সালের ৬ই ডিসেম্বর এরশাদের পতনের পর তিন রাজনৈতিক জোটের রূপরেখা ও বিরল সমঝোতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তার মূল লক্ষ্য ছিল দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া। ১৯৯১ সালের ঐতিহাসিক নিরপেক্ষ জাতীয় নির্বাচনের পর গঠিত বিএনপির কাছে ক্ষমতা বুঝিয়ে দিয়ে এবং সংবিধানে দ্বাদশ সংশোধনী পাশের পর ১৯৯১ সালের ১০ই অক্টোবর তিনি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে আগের পদে (সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি) ফিরে যান।
পেশাদার রাষ্ট্রপতি হিসেবে দ্বিতীয় মেয়াদ (১৯৯৬–২০০১): ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২৪শে জুলাই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ৯ই অক্টোবর শপথ নেন। এই মেয়াদের ক্ষেত্রে তিনি ১৯৯৬ সালের ৯ই অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর পর্যন্ত ৫ বছরের সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ করেছিলেন এবং নতুন রাষ্ট্রপতি আসা পর্যন্ত অতিরিক্ত এক মাস দায়িত্বে ছিলেন। তবে ১৯৯০-১৯৯১ সালের অর্পিত দায়িত্বের প্রথম মেয়াদটি ছিল নির্দিষ্ট লক্ষ্য ভিত্তিক পদত্যাগের মাধ্যমেই সমাপ্ত।
অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী : কয়েক মাসেই পদত্যাগ (A. Q. M. Badruddoza Chowdhury)
২০০১ সালের ১৪ই নভেম্বর বাংলাদেশের ১৫তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা মহাসচিব অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। কিন্তু মাত্র সাত মাসের মাথায় ২০০২ সালের ২১শে জুন তিনি পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মৃত্যুবার্ষিকীতে রাষ্ট্রপতির শ্রদ্ধা না জানানো, বাণীতে জিয়াকে ‘স্বাধীনতার ঘোষক’ হিসেবে উল্লেখ না করা, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ শব্দ না বলা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা প্রদর্শনের অভিযোগে বিএনপি দলীয় সাংসদরা তার বিরুদ্ধে চরম ক্ষুব্ধ হয়ে অনাস্থা ও অভিশংসনের (Impeachment) হুমকি দিলে তিনি নিজেই পদত্যাগপত্রের মাধ্যমে পদ ছাড়েন।
আরও পড়ুন:
অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ: একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ও প্রধান উপদেষ্টা (Iajuddin Ahmed)
অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর পদত্যাগের পর ২০০২ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর বিএনপির সমর্থনে রাষ্ট্রপতির পদে আসীন হন অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ। তার স্বাভাবিক ৫ বছরের সাংবিধানিক মেয়াদ ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ২০০৬ সালের রাজনীতিতে উদ্ভূত সংকটকালীন অবস্থায় তিনি একই সাথে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ‘প্রধান উপদেষ্টা’র দায়িত্ব নিয়ে বিতর্ক তৈরি করেন। পরবর্তীতে তুমুল রাজনৈতিক সহিংসতা ও একতরফা নির্বাচনের পটভূমিতে ২০০৭ সালের ১১ই জানুয়ারি (১/১১) সামরিক সমর্থিত চাপের মধ্যে তিনি প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়েন ও দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন। নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ায় ২০০৯ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারি মহাজোট সরকার গঠিত হওয়ার পর তিনি পদ ছাড়েন। সংবিধান অনুযায়ী উত্তরসূরি দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত পদে থাকলেও জরুরি অবস্থা ও প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে নাটকীয় অব্যাহতির জন্য তার এই মেয়াদের কার্যকাল রাজনৈতিকভাবে অনিয়মিত ছিল।
জিল্লুর রহমান: দায়িত্বে থাকতেই মৃত্যু (Zillur Rahman)
আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা জিল্লুর রহমান ২০০৯ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ভাষাসৈনিক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা জিল্লুর রহমান তার দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয় দিলেও পাঁচ বছরের সাংবিধানিক মেয়াদ পূর্ণ করার মাত্র ১১ মাস বাকি থাকতেই, ২০১৩ সালের ২০শে মার্চ সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। রাষ্ট্রপতি পদে তার পাঁচ বছরের নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। ফলে নির্ধারিত মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই অবসান ঘটে তার দায়িত্বকালের।
জিল্লুর রহমানের প্রয়াণের পর তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরবর্তীতে তিনি একক প্রার্থী হিসেবে পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আবদুল হামিদই একমাত্র ব্যক্তি, যিনি টানা দুই মেয়াদে দেশের রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি তার প্রথম মেয়াদে ২০১৩ সালের ২৪শে এপ্রিল এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ২০১৮ সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহণ করেন। টানা দীর্ঘ সময় এই সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি দিন রাষ্ট্রপতির আসনে থাকার রেকর্ডও গড়েছেন তিনি।
আরও পড়ুন:
মো. সাহাবুদ্দিন (Mohammed Shahabuddin)
২০২৩ সালের ২৪শে এপ্রিল আওয়ামী লীগ সরকারের মনোনয়নে ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৪ সালের আগস্টে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলেও রাষ্ট্রীয় আইনি ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে তিনি স্বপদে বহাল থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর নবগঠিত সরকারের শপথ পরিচালনা করেন। তবে সরকারের সাথে টানাপোড়েন, ব্যক্তিগত শারীরিক অসুস্থতা ও সার্বিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ১ বছর ৯ মাস বাকি থাকতেই ২০২৬ সালের ২৪শে জুলাই তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেন।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
বাংলাদেশে কোন কোন রাষ্ট্রপতি তাদের মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেননি
একনজরে পদত্যাগ, সামরিক অভ্যুত্থান, হত্যাকাণ্ড ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অসমাপ্ত রাষ্ট্রপতির মেয়াদের সংক্ষিপ্ত তালিকা
শেখ মুজিবুর রহমান
১৯৭১ (অস্থায়ী)
প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী হন; দ্বিতীয় মেয়াদে বাকশাল চালুর ৭ মাসের মাথায় সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন।
হত্যাকাণ্ড
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১২ জানুয়ারি ১৯৭২ – ২৪ ডিসেম্বর ১৯৭৩
সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সাথে মানসিক দূরত্ব ও অসন্তুষ্টি তৈরি হওয়ায় স্বেচ্ছায় পদত্যাগ।
স্বেচ্ছায় পদত্যাগ
মুহম্মদুল্লাহ
২৭ জানুয়ারি ১৯৭৪ – ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫
সংবিধান সংশোধন করে একদলীয় বাকশাল শাসন প্রবর্তনের ফলে পদবিলুপ্তি ও মেয়াদের অবসান ঘটে।
সাংবিধানিক পরিবর্তন
খন্দকার মোশতাক আহমদ
১৫ আগস্ট ১৯৭৫ – ৫ নভেম্বর ১৯৭৫
মেজর জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে পাল্টা সামরিক অভ্যুত্থানের মুখে মাত্র ৮১ দিনে ক্ষমতাচ্যুত।
সামরিক ক্ষমতাচ্যুতি
বিচারপতি আবু সাদাত মো. সায়েম
৬ নভেম্বর ১৯৭৫ – ২১ এপ্রিল ১৯৭৭
সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ও সামরিক চাপে পড়ে স্বাস্থ্যগত অজুহাতে পদত্যাগে বাধ্য হন।
চাপের মুখে পদত্যাগ
জিয়াউর রহমান
২১ এপ্রিল ১৯৭৭ – ৩০ মে ১৯৮১
১৯৭৮ সালে নির্বাচিত হলেও প্রথম মেয়াদ শেষ করার আগেই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাসদস্যদের হাতে নিহত।
হত্যাকাণ্ড
বিচারপতি আবদুস সাত্তার
৩০ মে ১৯৮১ – ২৪ মার্চ ১৯৮২
জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও চার মাসের মাথায় সেনাপ্রধান এইচ এম এরশাদের অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত।
সামরিক অভ্যুত্থান
বিচারপতি আহসান উদ্দীন চৌধুরী
২৭ মার্চ ১৯৮২ – ১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩
ক্ষমতাহীন রাষ্ট্রপতি হিসেবে ২০ মাস থাকার পর জেনারেল এরশাদ তাকে অপসারণ করে নিজে পদ দখল করেন।
অপসারণ
এইচ এম এরশাদ
১১ ডিসেম্বর ১৯৮৩ – ৬ ডিসেম্বর ১৯৯০
সর্বদলীয় ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মুখে নির্বাচিত মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই পদত্যাগে বাধ্য হন।
গণ-অভ্যুত্থানে পদত্যাগ
বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ
৬ ডিসেম্বর ১৯৯০ – ১০ অক্টোবর ১৯৯১ (অস্থায়ী)
অস্থায়ী দায়িত্বে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পাদন শেষে সংবিধান সংশোধন করে নিজের বিচারপতির পদে ফিরে যান।
দায়িত্ব হস্তান্তর
অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
১৪ নভেম্বর ২০০১ – ২১ জুন ২০০২
জিয়াউর রহমানের স্মৃতির প্রতি অবমাননাসহ নানা রাজনৈতিক ইস্যুতে নিজ দল বিএনপির অনাস্থা ও চাপের মুখে পদত্যাগ।
দলীয় চাপে পদত্যাগ
অধ্যাপক ইয়াজউদ্দিন আহমদ
৬ সেপ্টেম্বর ২০০২ – ১১ ফেব্রুয়ারি ২০০৯
১/১১-এর রাজনৈতিক সংকটে প্রধান উপদেষ্টার পদ ছাড়েন ও সংবিধানে উত্তরসূরি বিলম্বের কারণে বাড়তি সময় থাকেন।
মেয়াদ বিলম্বিত/অনিয়মিত
জিল্লুর রহমান
১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ – ২০ মার্চ ২০১৩
পাঁচ বছরের পূর্ণাঙ্গ মেয়াদের প্রায় ১১ মাস বাকি থাকতে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসারত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন।
মৃত্যু
মো. সাহাবুদ্দিন
২৪ এপ্রিল ২০২৩ – ২৪ জুলাই ২০২৬
রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন, সরকারের সাথে দূরত্ব ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে ১ বছর ৯ মাস আগে পদত্যাগ।
পদত্যাগ
রাষ্ট্রপতির নাম (President Name)
দায়িত্বকাল (Tenure)
বিদায়ের কারণ ও প্রেক্ষাপট (Reason for Departure)
বিদায়ের ধরন (Category)
২৫ জানু ১৯৭৫ – ১৫ আগস্ট ১৯৭৫
আরও পড়ুন:




