হরমুজ প্রণালি: ওমানের সঙ্গে জলপথ চুক্তি চূড়ান্তের পথে ইরান

হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করছে জাহাজ
হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করছে জাহাজ | ছবি: সংগৃহীত
0

হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের জন্য প্রস্তাবিত রুটের স্থানাঙ্ক (কোঅর্ডিনেট) নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছে ইরান ও ওমান। সমঝোতা চুক্তি ছাড়াই ওয়াশিংটন কেন ওমানের দক্ষিণাঞ্চলীয় রুটকে সমর্থন দিচ্ছে, লেবাননে ইসরাইলের হামলা কেন থামাচ্ছে না এবং নিষেধাজ্ঞার কারণে বিদেশে আটকে থাকা ইরানের কোনো অর্থ কেন ছাড়ছে না—এসব বিষয় নিয়ে আগেও যুক্তরাষ্ট্রের কড়া সমালোচনা করেছে তেহরান। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

শনিবার ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস কোরের (আইআরজিসি) মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে জানান, হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেয়ার নিজস্ব একটি কর্মপদ্ধতি রয়েছে; ওমানের সঙ্গে ইরানের চলমান আলোচনার সঙ্গে এটির কোনো সম্পর্ক নেই। তিনি আরও বলেন, এই কৌশলগত জলপথ পুনরায় চালু করতে ইরানের বেঁধে দেয়া শর্ত মেনে নেয়া ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সামনে আর কোনো পথ থাকবে না। আইআরজিসি এই প্রণালিকে শুধু অর্থনৈতিক জলপথ নয়, বরং ইরানের ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে জড়িত ক্ষমতার একটি বড় উৎস হিসেবে দেখে; যা তারা দর-কষাকষির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চায়।

মোহেব্বি রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনকে ওমানের সঙ্গে ইরানের চলমান আলোচনায় ‘হস্তক্ষেপ’ না করার আহ্বান জানিয়েছেন; যা প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলে দাবি করেছেন তিনি। শুক্রবার ইরানের কট্টরপন্থি-অধ্যুষিত পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের মুখপাত্র হাসান কাশকাভি জানিয়েছেন, ওমানের সঙ্গে চুক্তির কাঠামো চূড়ান্ত হয়েছে এবং শিগগির চুক্তি হতে পারে। তিনি বলেন, এখন শুধু ‘উচ্চপর্যায়ের সবুজ সংকেতের’ অপেক্ষা।

এক টিভি সাক্ষাৎকারে রাষ্ট্রপতি মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, গত জুনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের পক্ষে তিনি ‘জোরালোভাবে’ অবস্থান নেবেন। পদত্যাগের গুঞ্জনও তিনি নাকচ করে দিয়েছেন। কট্টরপন্থিরা অভিযোগ করেছিলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক সমাধানের বিরোধিতাকারীদের চাপে রাখতে পদত্যাগের হুমকি ব্যবহার করছেন তিনি। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, চুক্তি হলে ওমানের সঙ্গে যৌথ বিবৃতি দেয়া হতে পারে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে।

চুক্তি অনুযায়ী, ভেতরে আসা জাহাজগুলো ইরানের জলসীমার উত্তরের লেন দিয়ে ঢুকবে এবং বেরিয়ে যাওয়া জাহাজগুলো ওমানের জলসীমার দক্ষিণের লেন দিয়ে চলাচল করবে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, এই অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির মেয়াদ হবে ৬০ দিন, যা পরে বাড়ানো যেতে পারে। এ ছাড়া মধ্যবর্তী করিডোর থেকে নৌ-মাইন সরানো, সামরিক জাহাজের যাতায়াত এবং জাহাজগুলোর জন্য সমন্বিত ফি ব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা চলছে।

তবে ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ-অবরোধ এবং মার্কিন সামরিক সম্পদ প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে সংশয় রয়েছে। শান্তিপূর্ণ সময়ে বিশ্বের মোট তেলের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহনকারী এই প্রণালি পুরোপুরি খোলার জন্য এসব শর্ত পূরণ জরুরি বলে জানিয়েছে ইরান। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও দীর্ঘদিনের কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের সম্ভাবনা এখনো অস্পষ্ট। এই নিষেধাজ্ঞা ৯ কোটি ইরানির অর্থনৈতিক দুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।

এদিকে সামরিক তৎপরতা কিছুটা কমলেও উত্তেজনা এখনো চরমে। সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) জানিয়েছে, শনিবার হরমুজ প্রণালি পাড়ি দেয়ার সময় আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানির (এডনক) একটি জাহাজে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়। এতে কোনো হতাহতের খবর নেই। বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হামলাকে ‘জলদস্যুতার শামিল’ বলে অভিহিত করেছে ইউএইর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ইরান-সমর্থিত ইয়েমেনের হুতিরা সৌদি আরব ও সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলোর ওপর লোহিত সাগর ও বাব-এল-মান্দেব প্রণালিতে হামলা অব্যাহত রেখেছে। শুক্রবার হুতিরা ইয়েমেনের মারিব শহরে সৌদি-সমর্থিত সরকারের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় প্রাণঘাতী হামলা চালিয়েছে। বৃহস্পতিবার সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় নাজরানেও হামলা চালায় তারা।

চুক্তির সম্ভাবনায় বিশ্ববাজারেও ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে। শুক্রবার ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৩ ডলারে নেমে এসেছে। ইরানের ভেতরেও বাজারে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। শনিবার ইরানের জাতীয় মুদ্রা রিয়ালের মান কিছুটা বেড়ে ডলারপ্রতি ১৮ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে; যা গত সপ্তাহে সর্বনিম্ন ১৯ লাখ ৪০ হাজারে নেমে গিয়েছিল। তেহরান স্টক এক্সচেঞ্জের প্রধান সূচকও ২ শতাংশের বেশি বেড়ে ৫৫ লাখ ২০ হাজার পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে; যা প্রায় সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ের কাছাকাছি।

এএম