৪০ বছরের সর্বনিম্নে জাপানি মুদ্রা; ওয়াশিংটন ও টোকিওর বিরল যৌথ পদক্ষেপ

জাপানিজ মুদ্রা ইয়েন
জাপানিজ মুদ্রা ইয়েন | ছবি: সংগৃহীত
0

মার্কিন ডলারের বিপরীতে গত ৪০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে জাপানি মুদ্রা ইয়েন। এ মুদ্রার বিনিময় হার বাড়াতে গত সপ্তাহে যৌথভাবে বাজারে হস্তক্ষেপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান। এমন যৌথ পদক্ষেপ বিরল হলেও বিশ্বের তৃতীয় সর্বাধিক লেনদেন হওয়া মুদ্রা হিসেবে ইয়েনের অবমূল্যায়ন জাপানের গণ্ডি পেরিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সাধারণত মুদ্রার মান স্থিতিশীল রাখতে কোনো সরকার বা কেন্দ্রীয় ব্যাংক যখন বিদেশি মুদ্রা কেনাবেচা করে, তখন তাকে মুদ্রা হস্তক্ষেপ (কারেন্সি ইন্টারভেনশন) বলা হয়। ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবারের মতো ডলারের বিপরীতে ইয়েনের মান ১৬৩-তে নেমে যাওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এই যৌথ হস্তক্ষেপ শুরু করে। গত ৩১ জুলাই মার্কিন ট্রেজারি ইয়েনের বিনিময়ে ইউরো বিক্রি শুরু করে। একই সঙ্গে জাপানের কর্তৃপক্ষও ইয়েন কিনতে থাকে। এর ফলে বুধবার ইয়েনের মান ডলারের বিপরীতে ১৫৭-তে দাঁড়িয়েছে।

জাপান ১৯৯০-এর দশকের শুরু থেকেই অর্থনৈতিক স্থবিরতার সঙ্গে লড়ছে। প্রবৃদ্ধি বাড়াতে ব্যাংক অব জাপান দশকের পর দশক ধরে অতি-নিম্ন এমনকি ঋণাত্মক সুদহারের নীতি অনুসরণ করেছে, যা ইয়েনকে দুর্বল করেছে। যদিও দুর্বল ইয়েনের কারণে জাপানে রেকর্ডসংখ্যক পর্যটক আসছেন এবং রপ্তানি সাশ্রয়ী হয়েছে, তবুও এতে আমদানি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ চাপে পড়েছে। ২০২২ সাল থেকে টোকিও কয়েক দশক কোটি ডলার ব্যয় করে ইয়েনকে রক্ষার চেষ্টা করেছে। তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিসহ ধারাবাহিক নেতৃত্বের নেয়া নীতি এই প্রচেষ্টাকে কিছুটা ব্যাহত করেছে।

আইএনজি-র বৈশ্বিক বাজার প্রধান ক্রিস টার্নার আল জাজিরাকে বলেন, ‘তাকাইচি সবকিছু চান—প্রবৃদ্ধি, শিথিল আর্থিক নীতি, শিথিল মুদ্রানীতি ও স্থিতিশীল ইয়েন। কিন্তু তার নীতির মিশ্রণ ইয়েনকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং এতে মূল্যস্ফীতির সমস্যা তৈরি হচ্ছে।’

টোকিওর স্টেট স্ট্রিট ইনভেস্টমেন্ট ম্যানেজমেন্টের জ্যেষ্ঠ ফিক্সড ইনকাম স্ট্র্যাটেজিস্ট মাসাহিকো লু জানান, জাপান ঘনিষ্ঠ মিত্র হলেও যুক্তরাষ্ট্র মূলত নিজের স্বার্থেই এগিয়ে এসেছে। তিনি বলেন, ‘ইয়েনের অনিয়ন্ত্রিত পতন কেবল জাপানের সমস্যা নয়। এক পর্যায়ে এটি বৈশ্বিক তারল্য ও আর্থিক স্থিতিশীলতার ইস্যুতে পরিণত হয়। এ কারণেই ওয়াশিংটন হস্তক্ষেপ করেছে।’

যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, জাপান তাদের হাতে থাকা মার্কিন ট্রেজারি সিকিউরিটিজ বিক্রি করে দিতে পারে। গত মে মাসে জাপানের কাছে এই সিকিউরিটিজের পরিমাণ ছিল ১ দশমিক ১১৪ ট্রিলিয়ন ডলার। ইয়েনের পতন অব্যাহত থাকলে টোকিও নিজেদের মুদ্রাকে বাঁচাতে বাধ্য হয়ে এই ট্রেজারি বিক্রি করবে, যা যুক্তরাষ্ট্রে সুদহারের ওপর চাপ বাড়াবে।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এ যৌথ হস্তক্ষেপ স্বল্পমেয়াদে ইয়েনকে সহায়তা করলেও দীর্ঘমেয়াদে জাপানকে সুদহার বাড়ানোর মতো মৌলিক পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে জাপানের বেঞ্চমার্ক সুদহার ১ শতাংশ, যা ১৯৯৫ সালের পর সর্বোচ্চ হলেও যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য উন্নত অর্থনীতির তুলনায় অনেক কম।

মার্কিন গবেষণা সংস্থা মনিটারি পলিসি অ্যানালিটিক্সের প্রধান নির্বাহী ডেরেক ট্যাং বলেন, ‘জাপানের নিম্ন-সুদহার পরিবেশে পরিবর্তন না এলে এই হস্তক্ষেপ কার্যত ভালো টাকা খরচ করে খারাপ কিছু কেনার মতোই। অর্থনৈতিক মৌলিক নীতির শক্তির কাছে হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টা টেকসই হবে না।’

এএম