দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি: জামায়াত এমপির ভাইরাল ভিডিও এআই নয়, আরও যেসব জানা গেলো

জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলাম ও ফাঁস হওয়া ফুটেজ
জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলাম ও ফাঁস হওয়া ফুটেজ | ছবি: সংগৃহীত
0

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও জামায়াতে ইসলামীর নেতা গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে ভাইরাল ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত নয় বলে জানিয়েছে ফ্যাক্টচেকিং প্লাটফর্ম দ্য ডিসেন্ট। গাজী নজরুল ইসলামও এক বিবৃতিতে নিশ্চিত করেছেন, ভিডিওটি এআই নয়। একইসঙ্গে ভিডিওতে থাকা তরুণীকে তিনি নিজের দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করেছেন।

গতকাল (সোমবার, ২০ জুলাই) রাত থেকে ভিডিওটি বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর জামায়াত-সমর্থিত কয়েকটি ফেসবুক আইডি থেকে দাবি করা হয়, ভিডিওটি এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদনা করা হয়েছে এবং ভিডিওতে থাকা নারী গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী।

তবে দ্য ডিসেন্টের ফ্যাক্টচেকে বলা হয়েছে, ভিডিওটি বিশ্লেষণে এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদনার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও ভিডিওটির স্ক্রিনশট ব্যবহার করে এআই-নির্মিত কিছু স্থিরচিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো হয়েছে।

ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর স্থিরচিত্র | ছবি: সংগৃহীত

এছাড়াও ফ্যাক্টচেকিং প্ল্যাটফর্ম রিউমর স্ক্যানার জানিয়েছে, গাজী নজরুল ইসলামের ভাইরাল হওয়া ব্যক্তিগত ভিডিওটিকে এআই দিয়ে তৈরি বলে দাবি করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অসংখ্য পোস্ট ছড়ানো হচ্ছে। তবে তাদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ভিডিওটি এআই-নির্মিত নয়; এটি আসল ভিডিও। ভাইরাল হওয়া দীর্ঘ ভিডিওটিতে কোনো ধরনের অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়নি। এছাড়া অডিও বিশ্লেষণেও কোনো অসঙ্গতির প্রমাণ মেলেনি। ভিডিওর বিভিন্ন উপাদান পৃথকভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

‘মরিয়ম আমার দ্বিতীয় স্ত্রী’

এ ঘটনায় লিখিত এক বিবৃতিতে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, ভিডিওতে থাকা ১৮ বছর বয়সী মরিয়ম বেগম তার দ্বিতীয় স্ত্রী। তার ভাষ্য, গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে এবং প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতে তাদের বিয়ে হয়েছে।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, ১৩ জুলাই তিনি প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলাম, দ্বিতীয় স্ত্রী মরিয়ম বেগম এবং চালক ওবায়দুল্লাহকে নিয়ে ঢাকার মগবাজারে শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর অফিসে যান। সেখানে অবস্থানকালে চালক পরিকল্পিতভাবে কয়েকজন অপরিচিত ব্যক্তিকে ভেতরে প্রবেশ করান।

তার অভিযোগ, ওই ব্যক্তিরা পরিচয় জানতে চেয়ে হেনস্তা করেন এবং পরে নিচে নিয়ে গিয়ে পাঁচ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। কিছু টাকা দেয়ার পর তারা সেখান থেকে বের হতে সক্ষম হন।

টাইমস্ট্যাম্পে অসঙ্গতি

তবে দ্য ডিসেন্ট জানিয়েছে, ভাইরাল সিসিটিভি ফুটেজে দৃশ্যমান টাইমস্ট্যাম্প অনুযায়ী ভিডিওটি ২০২৩ সালের ১ জুলাই ধারণ করা হয়েছে। অথচ গাজী নজরুল দাবি করেছেন ঘটনাটি ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই ঘটেছে।

সময়গত অসঙ্গতি সম্পর্কে জানতে চাইলে গাজী নজরুল জানান, টাইমস্ট্যাম্পে এ পার্থক্য কেন দেখা যাচ্ছে, সে বিষয়ে তার কোনো ধারণা নেই।

প্রথম স্ত্রীরও সমর্থন

ঘটনার পর নিজের ফেসবুক পোস্টে গাজী নজরুল ইসলাম দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে এবং মরিয়ম আক্তার তার বৈধ দ্বিতীয় স্ত্রী।

এদিকে, তার প্রথম স্ত্রী মাকসুদা ইসলামও ভিডিও বার্তায় বলেন, মরিয়মের সঙ্গে তার স্বামীর বিয়ে হয়েছে এবং এ নিয়ে অপপ্রচার বন্ধ না হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।

মরিয়মের বাবা মাসুম বিল্লাহও দাবি করেন, গত ১৭ জুন তিন লাখ টাকা দেনমোহরে তাদের বিয়ে হয়েছে। তিনি অভিযোগ করেন, তার শ্যালক ও গাজী নজরুলের গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে ঘটনাটি ছড়িয়ে দিয়েছেন।

ভিডিওতে থাকা মরিয়মও বলছেন, গাজী নজরুল ইসলাম তার স্বামী এবং তারা তার বাবার অফিসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।

ফেসবুকে প্রচার ও নারীর বায়োডাটা | ছবি: সংগৃহীত

বায়োডাটায় ‘অবিবাহিত’

তবে দ্য ডিসেন্ট একটি নতুন তথ্যও প্রকাশ করেছে। তাদের হাতে আসা মরিয়মের একটি বায়োডাটায় দেখা যায়, সেটিতে ২২ জুন তারিখে গাজী নজরুল ইসলামের সুপারিশ ও স্বাক্ষর রয়েছে। সেখানে সবুজ কালিতে হাতে লেখা আছে ‘জোর সুপারিশ করছি’।

কিন্তু ওই বায়োডাটায় মরিয়মের বৈবাহিক অবস্থা ‘অবিবাহিত’ উল্লেখ করা হয়েছে।

যদি ১৭ জুন তাদের বিয়ে হয়ে থাকে, তাহলে পাঁচ দিন পর স্বাক্ষরিত বায়োডাটায় ‘অবিবাহিত’ লেখা হলো কেন—এ বিষয়ে জানতে গাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ঘটনার বিষয়ে কথা বলেছেন সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান মাওলানা আজিজুর রহমান। তিনি বলেন, ‘ভিডিওটি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এমপি সাহেব আমাদের জানিয়েছেন, ভিডিওতে যাকে দেখা যাচ্ছে তিনি উনার দ্বিতীয় স্ত্রী। প্রথম স্ত্রীর সম্মতিক্রমেই এই বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে ভিডিওটি কীভাবে প্রকাশ পেল, সেটি আমরা খতিয়ে দেখছি।’

কবে নাগাদ এই বিয়ে হয়েছে? এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াতের এই নেতা জানান, তিনি বিয়ের সঠিক তারিখ নিশ্চিত বলতে পারছেন না, তবে তা ‘বেশ কিছুদিন আগে’ সম্পন্ন হয়েছে বলে তারা জেনেছেন।

ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগ

গাজী নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, তার গাড়িচালক ওবায়দুল্লাহ; যিনি মরিয়মের মামা—এই ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। তার দাবি, চালক তার কাছে পাঁচ লাখ এবং শ্বশুর মাসুম বিল্লাহর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেন। টাকা না পেয়ে সিসিটিভি ফুটেজ ব্যবহার করে কুরুচিপূর্ণভাবে ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

এ ঘটনাকে নিজের ও পরিবারের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত চরিত্রহননের অপচেষ্টা দাবি করে তিনি জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

এনএইচ