ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীদের জন্য ‘ট্রুথ এপিআই’ চালু; বিতর্কে ট্রাম্প মিডিয়া

ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া নিজের পোস্টের প্রিন্টআউট দেখাচ্ছেন
ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া নিজের পোস্টের প্রিন্টআউট দেখাচ্ছেন | ছবি: সংগৃহীত
0

নিজের ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে করা পোস্টগুলোতে দ্রুততর প্রবেশাধিকার দিতে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে মাসে ১ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি। বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত ব্যক্তিরা এই তথ্য জানিয়েছেন। রয়টার্সের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সূত্রগুলো নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, ট্রুথ সোশ্যালের মালিক ট্রাম্প মিডিয়া অ্যান্ড টেকনোলজি গ্রুপ (ডিজেটিও) গত কয়েক সপ্তাহে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩ বছরের চুক্তিতে যোগ দিলে মাসে ৬০ হাজার ডলারের একটি ছাড়যুক্ত পরিকল্পনার প্রস্তাবও দিয়েছে। আলোচনাগুলো গোপনীয় বলে সূত্রগুলো নিজেদের পরিচয় গোপন রাখার শর্ত জুড়ে দিয়েছে।

বৃহস্পতিবার টিএমটিজি ‘ট্রুথ এপিআই’ নামে অর্থের বিনিময়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত একটি ডেটা ফিডের ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে ব্যাংক ও ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলো ট্রুথ সোশ্যালের সবচেয়ে প্রভাবশালী ১০টি অ্যাকাউন্টের পোস্টে সবচেয়ে দ্রুত প্রবেশাধিকার পাবে। তবে কোম্পানিটি এর দাম সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

এই পদক্ষেপ কোম্পানিটির জন্য ডেটা লাইসেন্সিং খাতে প্রথম পা রাখার সুযোগ তৈরি করবে এবং আয়ের নতুন উৎসের দ্বার উন্মোচন করবে। তবে ঘোষণার পরপরই ডেমোক্র্যাটদের কড়া সমালোচনার মুখে পড়েছে এই উদ্যোগ।

সিনেটের অর্থ কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট নেতা ও ওরেগনের সিনেটর রন উইডেন বলেছেন, এই পদক্ষেপ আর্থিকভাবে ট্রাম্প পরিবারকে লাভবান করবে এবং ‘ওয়াল স্ট্রিটের ব্যবসায়ীদের ধনী বানাবে’।

হোয়াইট হাউস উইডেনের এই বক্তব্যের বিষয়ে টিএমটিজিকে প্রশ্ন করতে বলেছে। তবে কোম্পানিটি মন্তব্যের অনুরোধে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দেয়নি।

ট্রাম্পের সামাজিক মাধ্যমের পোস্টগুলো প্রায়ই বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। শীর্ষ ট্রেডিং প্রতিষ্ঠান, হেজ ফান্ড ও আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মুনাফা মূলত তাদের লেনদেনের গতির ওপর নির্ভরশীল।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের ৯ এপ্রিল ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে জানান, তিনি তার আরোপ করা নতুন শুল্কগুলোর অনেকগুলো ৯০ দিনের জন্য স্থগিত করবেন। এই ঘোষণার পরপরই ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলো তীব্রভাবে ঊর্ধ্বমুখী হয়ে ওঠে।

সূত্রগুলো জানায়, হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেডিং প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ট্রুথ এপিআইয়ের প্রবেশাধিকার হবে অপরিহার্য। কারণ, মাত্র কয়েক মিলিসেকেন্ডের গতির সুবিধা বড় ধরনের লেনদেনে লাখ লাখ ডলারের মুনাফা এনে দিতে পারে।

বৃহস্পতিবার আগে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস ১ লাখ ডলারের সাবস্ক্রিপশন ফি বিষয়ক এই আলোচনার কথা জানিয়েছিল।

নীতি ঘোষণা থেকে মুনাফা
বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানিগুলোর তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে টিএমটিজি নিজেদের মিডিয়া ব্যবসাকে সম্প্রসারিত করতে হিমশিম খাচ্ছে। নতুন এই পণ্য প্রভাবশালী পোস্টগুলোর সার্বক্ষণিক তথ্য দেবে এবং ২০২২ সালের পুরোনো পোস্টগুলোর একটি সংরক্ষণাগারও এতে থাকবে। কোম্পানিটি জানিয়েছে, আগামী ১ আগস্ট চালুর আগেই তারা কয়েকজন গ্রাহক পেয়ে গেছে। তবে তারা কারা, সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি।

ট্রুথ সোশ্যালে সবচেয়ে বেশি অনুসরণ করা অ্যাকাউন্টগুলোর মধ্যে রয়েছে ট্রাম্পের নিজের এবং তার ঘনিষ্ঠদের অ্যাকাউন্ট। এদের মধ্যে আছেন তার ছেলে ডোনাল্ড ট্রাম্প জুনিয়র ও এরিক ট্রাম্প এবং ড্যান বনজিনো ও শন হ্যানিটির মতো বিশিষ্ট সমর্থকেরা।

নিয়ন্ত্রক সংস্থার নথি অনুযায়ী, ডোনাল্ড জে. ট্রাম্প রিভোকেবল ট্রাস্টের হাতে টিএমটিজির প্রায় ১১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার শেয়ার রয়েছে, যা কোম্পানিটির মোট বকেয়া শেয়ারের প্রায় ৪১ শতাংশ। ট্রাম্পের সন্তানদের তত্ত্বাবধানে থাকা এই ট্রাস্টটি প্রেসিডেন্টের বিনিয়োগ পরিচালনা করে।

প্রশাসনের ঘোষিত নীতি থেকে ট্রাম্প ও তার পরিবার নিজেদের আর্থিক লাভ বাড়ানোর চেষ্টা করছে কি না, তা নিয়ে সমালোচকেরা প্রশ্ন তুলেছেন। ট্রাম্পের সবচেয়ে সাম্প্রতিক আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত বছর তার পরিবারের ক্রিপ্টো উদ্যোগ থেকে ১৪০ কোটি ডলারের বেশি আয় হয়েছে। ট্রাম্পের নিজের ঘোষিত নীতিগুলোর কারণেই ডিজিটাল সম্পদ থেকে তার আয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

নিরপেক্ষ নজরদারি সংস্থা সিটিজেনস ফর রেসপনসিবিলিটি অ্যান্ড এথিকস ইন ওয়াশিংটনের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড শেরম্যান বলেন, ট্রুথ এপিআই ব্যবস্থাটি ‘ব্যাপকভাবে অনৈতিক’ হবে। কারণ, প্রেসিডেন্টের নিজের পোস্টে দ্রুত প্রবেশাধিকারের জন্য প্রদত্ত অর্থ থেকেই তিনি লাভবান হবেন। তবে এটি বেআইনি কি না, তা প্রকাশ্যে থাকা তথ্য থেকে নির্ধারণ করা কঠিন বলে জানান তিনি।

শেরম্যান ও অন্য বিশেষজ্ঞরা উল্লেখ করেছেন, দুর্নীতি ঠেকাতে সংবিধানের যে ইমোলুমেন্টস ধারা রয়েছে, তা এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। এই ধারা কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া বিদেশি সরকারের কাছ থেকে ফেডারেল কর্মকর্তাদের উপহার নেয়া এবং অঙ্গরাজ্যগুলোর কাছ থেকে প্রেসিডেন্টের উপহার নেয়া নিষিদ্ধ করে।

আবার ফেডারেল বিধিবিধান অনুযায়ী, উপাদানগত ও অ-জনসাধারণ তথ্যের ভিত্তিতে কোনো সিকিউরিটির কেনাবেচা ব্যাপকভাবে নিষিদ্ধ। তবে শেরম্যানের মতে, এই বিধিনিষেধ এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে না। কারণ সম্ভাব্য শত শত বা হাজার হাজার মানুষ ট্রাম্পের পোস্টগুলোতে আগে প্রবেশাধিকার পাবে।

তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয় না কংগ্রেস বা কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা কখনো ভেবেছিল যে, একজন প্রেসিডেন্ট বা বাজার-প্রভাবক ব্যক্তি এ ধরনের অর্থের বিনিময়ে প্রবেশাধিকারের ব্যবস্থায় জড়াবেন।’

সিনেট ব্যাংকিং কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট মার্কিন সিনেটর এলিজাবেথ ওয়ারেন এটিকে ‘প্রেসিডেন্সিকে ব্যবহার করে মুনাফা লোটার এবং ওয়াল স্ট্রিটকে সমৃদ্ধ করার এক জঘন্য ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন। তার ভাষ্য, ‘এতে আমেরিকানদের কোনো উপকার হবে না।’

হোয়াইট হাউসের ভাষ্য, ট্রাম্পের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য দেখাশোনা করছে তার সন্তানেরা। তবে তার ট্রাস্টে জমা হওয়া আয়ের সুবিধাভোগী স্বয়ং প্রেসিডেন্ট।

চলতি বছর টিএমটিজির শেয়ারের দাম প্রায় ২৭ শতাংশ কমেছে। শুক্রবার শেয়ারটির দাম ৯ দশমিক ৬৬ ডলারে প্রায় অপরিবর্তিত ছিল। এতে কোম্পানিটির বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৭০ কোটি ডলার।

এএম