ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট বিপর্যয়ের মাত্রা ১৯৭৩ সালের আরব তেল অবরোধ, ১৯৭৯ সালের ইরান বিপ্লব এবং ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের সঙ্গে তুলনার নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে এটি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের বিবর্তনও স্পষ্ট করে তুলছে।
ভিন্ন ধরনের জ্বালানি ধাক্কা
আগের সংকটগুলোর তুলনায় ইরান যুদ্ধ একই সঙ্গে অপরিশোধিত তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস, পরিশোধিত জ্বালানি ও সারের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। কয়েক দশকের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং পরিশোধিত জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান ভূমিকা যেসব দুর্বলতা তৈরি করেছিল, এই যুদ্ধ তা প্রকাশ্যে এনেছে।
১৯৭০-এর দশকের তেল ধাক্কাগুলো বড় আমদানিকারক দেশগুলোয় স্থায়ী অর্থনৈতিক ক্ষত রেখে গিয়েছিল এবং জ্বালানি নীতিও নতুন করে গড়ে দিয়েছিল। ওই সংকটের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই শিল্পোন্নত দেশগুলোকে জ্বালানি নিরাপত্তায় পরামর্শ ও জরুরি মজুত সমন্বয়ের জন্য আইইএ প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমান সংকট মোকাবিলায় সংস্থাটি কৌশলগত রিজার্ভ থেকে রেকর্ড ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড় করেছে। বাজার স্থিতিশীল রাখতে এবং হারানো মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পূরণেই এই পদক্ষেপ।
মাত্রার দিক থেকে বর্তমান সংকট কোথায়?
আইইএ জানিয়েছে, দৈনিক সরবরাহের সর্বোচ্চ ক্ষতি ছাড়িয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল, যা চলতি বছরের প্রত্যাশিত বৈশ্বিক তেল চাহিদার (১০ কোটি ৩৩ লাখ ব্যারেল) প্রায় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। আইইএর তথ্য অনুযায়ী, এটি ১৯৭৩-৭৪ সালের আরব তেল অবরোধকালীন দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেল, ইরান বিপ্লবের ৫৬ লাখ ব্যারেল এবং ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধের ৪৩ লাখ ব্যারেল সর্বোচ্চ ক্ষতির চেয়ে অনেক বেশি।
এই সংঘাত কাতারে বৈশ্বিক তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) উৎপাদনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ বন্ধ করে দিয়েছে। ১৯৭০-এর দশকের তেল ধাক্কার সময় এলএনজি বাণিজ্য প্রায় শূন্য ছিল; কাতার নিজেই ১৯৯৬ সালের আগে রপ্তানি শুরু করেনি। উপসাগরীয় অঞ্চলের রিফাইনারি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ডিজেল ও জেট ফুয়েলের ঘাটতিও তৈরি হয়েছে, যা সরবরাহ বিপর্যয়কে জ্বালানি বাজারেও ছড়িয়ে দিয়েছে। গত কয়েক দশকে গড়ে ওঠা উপসাগরের বৃহৎ রিফাইনারিগুলো এখন আফ্রিকা, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারের বড় সরবরাহকারী।
আরগাস মিডিয়ার হিসাব অনুযায়ী, এই সংঘাতের কারণে কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রায় ২ কোটি ৪০ লাখ মেট্রিক টন এলএনজি সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেছে। ২০২৫ সালে বৈশ্বিক এলএনজি বাণিজ্য ৪২ কোটি ৮০ লাখ টন—আইইএর এই তথ্য বিবেচনায় নিলে তা বার্ষিক বৈশ্বিক এলএনজি সরবরাহের প্রায় ৫ দশমিক ৬ শতাংশ।
সময়কাল ও মোট ক্ষতির তুলনা
আইইএ গত ১৩ মে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, উপসাগরীয় উৎপাদকদের কাছ থেকে মোট সরবরাহের ক্ষতি ইতিমধ্যে ১০০ কোটি ব্যারেল ছাড়িয়েছে। এরপর ১৪ মে থেকে ১৭ জুন যুদ্ধ বন্ধকারী মার্কিন-ইরান অন্তর্বর্তী চুক্তি পর্যন্ত ৩৫ দিনে আরও দৈনিক ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যারেল ক্ষতি হয়েছে। এতে বাজার থেকে প্রায় ১৫০ কোটি ব্যারেল তেল হারিয়ে গেছে বলে রয়টার্সের হিসাবে বলা হয়েছে। যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও কয়েক মাস ধরে বিঘ্ন অব্যাহত থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। গ্যাসের ক্ষেত্রে তা বছর গড়িয়ে যেতে পারে।
ইরান বিপ্লবের দৈনিক ক্ষতি বর্তমান সংকটের চেয়ে কম হলেও মোট প্রভাব ছিল বেশি। মার্কিন জ্বালানি বিভাগের হিসাবে, ১৯৭৮ থেকে ১৯৮১ সালের মধ্যে ইরানের অপরিশোধিত তেল উৎপাদন দৈনিক গড়ে ৩৯ লাখ ব্যারেল কমেছে। এতে তিন বছরে প্রায় ৪৩০ কোটি ব্যারেল উৎপাদন হারিয়েছে বলে রয়টার্স হিসাব করছে। তবে এর কিছু ক্ষতি অন্যান্য উপসাগরীয় দেশের বাড়তি উৎপাদনে পূরণ হয়ে যায়।
তেল বিষয়ক সাংবাদিক ও লেখক ইয়ান সেমুর ১৯৮০ সালে প্রকাশিত তার বইয়ে অনুমান করেছিলেন, ১৯৭৯ সালে ইরান দৈনিক গড়ে ৩১ লাখ ব্যারেল তেল উৎপাদন করত, যেখানে বিপ্লবের আগে তা ছিল প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ, শুধু ওই এক বছরেই ১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি সরবরাহ হারিয়েছিল। ওপেকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮০ সালে উৎপাদন আরও কমে দৈনিক গড়ে ১৪ লাখ ৭০ হাজার ব্যারেলে নামে। ১৯৭৮ সালের উৎপাদনের তুলনায় ১৯৭৯ ও ১৯৮০ সালের মোট ক্ষতি ২৭০ কোটি ব্যারেল ছাড়িয়েছিল, যা এখনো বর্তমান সংকটের ক্ষতির চেয়ে বেশি।
১৯৭৩-৭৪ সালের আরব তেল অবরোধের সময় তিন মাসে ধীরে ধীরে দৈনিক ৪৫ লাখ ব্যারেল উৎপাদন কমানো হয়। রয়টার্সের হিসাবে, ওই অবরোধ বাজার থেকে প্রায় ৫৩ থেকে ৬৫ কোটি ব্যারেল তেল সরিয়ে দিয়েছিল, যা বর্তমান বিপর্যয়ের চেয়ে অনেক কম। আইইএর সদস্য দেশ অস্ট্রেলিয়ার একটি সরকারি নথি অনুযায়ী, ১৯৯১ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ প্রায় চার মাস তেল উৎপাদনে বিঘ্ন ঘটিয়েছিল। দৈনিক গড়ে ৪৩ লাখ ব্যারেল ক্ষতি ধরলে মোট প্রায় ৫১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল সরবরাহ হারিয়েছিল, যা বর্তমান সংকটের তুলনায় কম।





