আজ (বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নমুনাকাঠামো ব্যবহার করে দেশের আটটি বিভাগের ১ হাজার ১৪৯টি এলাকা থেকে সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে এই জরিপটি করা হয়েছে, যেখানে সুনির্দিষ্ট ১৮টি সেবা খাতের চিত্র উঠে এসেছে।
জরিপের ফলাফল অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ২০২৫ সালেও পাসপোর্ট (৭৬ দশমিক ৬ শতাংশ) ও বিআরটিএ (৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ) খাত থেকে সেবা নিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি মানুষ ঘুষ ও দুর্নীতির শিকার হয়েছেন। এর পরেই রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা, কৃষি, ভূমি ও বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা খাত। এসব খাতে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণও ছিল সবচেয়ে বেশি।
তবে আশার কথা হলো, সার্বিকভাবে পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে। জরিপ অনুযায়ী, বিগত এক বছরে খানাপ্রতি বা পরিবারপ্রতি গড় ঘুষের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ১২৪ টাকা।
জরিপে অংশ নেয়া ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার স্পষ্ট জানিয়েছে, ঘুষ ছাড়া বর্তমানে সরকারি সেবা পাওয়া একেবারেই কঠিন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও বিচারিক সেবায় ঘুষের উচ্চহার মানুষের ন্যায়বিচার পাওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
দুর্নীতির শিকার হওয়ার পরও দেশের ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ পরিবার কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেনি। তাদের মতে, দেশের পুরো ব্যবস্থাই এখন দুর্নীতিগ্রস্ত। আবার প্রায় অর্ধেক পরিবারেরই জানা নেই যে দুর্নীতির অভিযোগ কোথায় এবং কীভাবে করতে হয়। দেশের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পর্কে ২৯ দশমিক ৫ শতাংশ এবং সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থা (জিআরএস) সম্পর্কে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ পরিবার জানলেও, সেখানে অভিযোগ করার হার অত্যন্ত নগণ্য। কারণ অভিযোগ করা হলেও অনেক ক্ষেত্রে তা গ্রহণ করা হয়নি অথবা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
টিআইবির জরিপে একটি বৈষম্যের চিত্র ফুটে উঠেছে। দেখা গেছে, শহরাঞ্চলের (৫৮.৫ শতাংশ) তুলনায় গ্রামাঞ্চলের পরিবারগুলো (৬৬ শতাংশ) বেশি ঘুষের শিকার হয়। তবে ঘুষের মোট অঙ্কের পরিমাণের দিক থেকে শহরের পরিবারগুলোকে বেশি টাকা গুনতে হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের অনুপাতের তুলনায় অনেক বেশি ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা নারী, আদিবাসী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বিভিন্ন সেবা খাতে ডিজিটাল সেবা বা অনলাইন পদ্ধতি চালু করা হলেও তা দুর্নীতি কমাতে পুরোপুরি কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। অনেক ক্ষেত্রে সেবাগ্রহীতাদের এখনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে, যার ফলে ঘুষ ও দুর্নীতির সনাতন সুযোগগুলো থেকেই যাচ্ছে।
জরিপে অংশগ্রহণকারীরা মনে করেন, দেশে চলমান এই প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো বিচারহীনতার সংস্কৃতি, সচেতনতার অভাব এবং দুর্নীতিতে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তির বদলে উল্টো বিভিন্ন সামাজিক বা পেশাগত সুবিধা পাওয়া। টিআইবি এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে পুরো সেবা খাতকে দালালমুক্ত করা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছে।





