নিষেধাজ্ঞা সাময়িক প্রত্যাহার; শর্ত না মানলে ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি ট্রাম্পের

ডোনাল্ড ট্রাম্প
ডোনাল্ড ট্রাম্প | ছবি: রয়টার্স
0

প্রাথমিক শান্তি চুক্তির আওতায় প্রথম দফার আলোচনার পর গতকাল (সোমবার, ২২ জুন) থেকে ৬০ দিনের জন্য ইরানের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান যদি চুক্তির শর্ত না মানে, তবে তাকে ‘যা করার তা করতে হবে’। আল জাজিরার প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স জানিয়েছেন, ‘সুইজারল্যান্ডে ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা একটি চূড়ান্ত শান্তি চুক্তির জন্য ভালো ভিত্তি তৈরি করেছে। যদিও ইরান তাদের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরুর বিষয়টি অস্বীকার করেছে। মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান ও কাতার জানিয়েছে, গত সপ্তাহে সই হওয়া অন্তর্বর্তী চুক্তির ওপর ভিত্তি করে কাতারি মালিকানাধীন সুইস পাহাড়ি রিসোর্ট বার্গেনস্টকে এই আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে উভয় পক্ষ ৬০ দিনের মধ্যে একটি স্থায়ী চুক্তির রোডম্যাপ বা রূপরেখায় সম্মত হয়েছে।

মার্কিন মিত্র ইসরাইল এবং ইরানপন্থি হিজবুল্লাহর মধ্যে লেবাননে লড়াই বন্ধের একটি কৌশলেও তারা একমত হয়েছে। এছাড়া কৌশলগত জলপথ হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত এড়াতে এবং বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে তারা একটি যোগাযোগ লাইন বা হটলাইন চালু করেছে। ইরানকে অর্থনৈতিক স্বস্তি দেয়ার চুক্তির আওতায় পরিকল্পিত কয়েকটি পদক্ষেপের প্রথমটি হিসেবে আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ। এর ফলে তেহরান তেল ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিক্রি করতে এবং এর অর্থ গ্রহণ করতে পারবে।

অঞ্চলজুড়ে সংঘাত বন্ধের লক্ষ্যে হওয়া এই চুক্তির অধীনে লেবাননে লড়াইয়ে একটি টেকসই বিরতির কথা জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। তবে ইসরাইল বলেছে, তারা দক্ষিণ লেবাননে একটি নিরাপত্তা বলয় বজায় রাখবে এবং ইসরাইলি সেনা ও নাগরিকদের বিরুদ্ধে থাকা হুমকিগুলো ‘নিষ্ক্রিয়’ করার কাজ চালিয়ে যাবে। এদিকে গতকাল (সোমবার, ২২ জুন) হরমুজ প্রণালি দিয়ে ট্যাঙ্কার চলাচল বাড়তে শুরু করেছে। এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পরিচালনার বিষয়ে ইরানের সঙ্গে আলোচনার সময় ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আন্তর্জাতিক আইন এবং টোলমুক্ত নিরাপদ চলাচলের প্রতি তার দেশের প্রতিশ্রুতির কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন।

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের হামলা এবং লেবাননে ইসরাইলি হামলায় হাজার হাজার মানুষ নিহত এবং লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। ইরান যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে বাজারগুলোকে নাড়িয়ে দিয়েছে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়িয়েছে। গতকাল (সোমবার, ২২ জুন) অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশ কমার পর মঙ্গলবারও তা নিম্নমুখী ছিল। ইসরাইল এই শান্তি চুক্তির অংশ ছিল না, তবে তারা গত শুক্রবার লেবাননে একটি নতুন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। এরপর আরও এক দিন তীব্র লড়াই চললেও লেবাননের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, শনিবার রাত থেকে তা কমে এসেছে।   ওয়াশিংটনে ইসরাইল ও লেবাননের মধ্যে নতুন দফার আলোচনা শুরু হওয়ার কথা ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের আলোচনার অংশ হিসেবে লেবাননকে যুক্ত করার সিদ্ধান্তে এই আলোচনা কিছুটা ঢাকা পড়লেও বৈরুত সরাসরি আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।

সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার পর থেকেই ইতিবাচক সুর বজায় রাখা জেডি ভ্যান্স বলেন, তেহরান দেশে পরমাণু পরিদর্শকদের প্রবেশের অনুমতি দিতে রাজি হয়েছে। এছাড়া বিদেশে জব্দ করা সম্পদ পরিচালনা এবং যুদ্ধবিরতি ব্যবস্থাপনার জন্য কৌশল প্রতিষ্ঠায় তারা সম্মত হয়েছে। আলোচনায় অংশ নেয়ার পর সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘আমরা একটি সফল চূড়ান্ত চুক্তির জন্য খুব ভালো ভিত্তি তৈরি করেছি।’ তবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ইরনাকে বলেছেন, ইরান এখনো পরমাণু বিষয়ে কোনো আলোচনা করেনি বা নতুন কোনো প্রতিশ্রুতি দেয়নি।

গতকাল (সোমবার, ২২ জুন) ট্রুথ সোশ্যালে দেয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ‘পরমাণু সততা’ নিশ্চিত করতে ইরান অস্ত্র পরিদর্শনে সম্মত হবে। পরে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘ইরান যদি তাদের চুক্তি মেনে না চলে বা তারা যদি ঠিকমতো আচরণ না করে, তবে আমাকে যা করতে হবে, আমি তা-ই করব।’ গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল প্রথম দফা বিমান হামলা চালানোর পর থেকেই আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) পরিদর্শন সীমিত করে দেয় ইরান। আর ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর তা পুরোপুরি স্থগিত করা হয়। তবে ইরান দাবি করে আসছে, তাদের পরমাণু কর্মসূচি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ।

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানিয়েছেন, তেহরান তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির জন্য ছাড়পত্র পেয়েছে। এছাড়া বিদেশে জব্দ থাকা কিছু সম্পদ অবমুক্ত করা এবং ইরানের জন্য একটি পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালুর বিষয়টিও নিশ্চিত করা হয়েছে। জেডি ভ্যান্স জানান, ট্রাম্পের জামাতা ও হোয়াইট হাউসের দূত জ্যারেড কুশনার এমন একটি প্রক্রিয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন, যার মাধ্যমে ইরানের জব্দ করা অর্থ অবমুক্ত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও কাতার তা নিয়ন্ত্রণ করবে। এই অর্থ কেবল যুক্তরাষ্ট্রের ভুট্টা, সয়াবিন ও গম কেনার কাজে ব্যয় করা হতে পারে। সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘সুতরাং, আমরা যে অর্থ ছাড় করছি তা আমাদের কৃষকদের কাছেই যাবে।’

তবে ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর আবদোলনাসের হেমমাতি জানিয়েছেন, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হেমমাতির মতে, বাকি জব্দ করা অর্থের অন্তত কিছু অংশ নিষেধাজ্ঞা মুক্ত অন্যান্য পণ্য কিনতেও ব্যবহার করা যেতে পারে। চলতি সপ্তাহের বাকি দিনগুলোতেও দুই দেশের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলবে বলে কথা রয়েছে।

এএম